রাজধানীতে অপরাধ দমনের নানামুখী পদক্ষেপের পরও থামছে না চাঁদাবাজি ও জবরদখলের দৌরাত্ম্য। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতেই রেকর্ড করা হয়েছে শত শত চাঁদাবাজির মামলা। সিএমএম আদালতের নথি ও পুলিশি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র, যেখানে দেখা যাচ্ছে এসব মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশেই তদন্তে অপরাধের সত্যতা মিলেছে। তবে আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য আট মাসে রাজধানীতে মোট ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানায় সবচেয়ে বেশি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। মোট ৭২৩টি মামলার বিপরীতে ইতোমধ্যে ৪২৫টির তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন বা চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। তবে বাকি প্রায় একচল্লিশ শতাংশ মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া গত বিশ মাসের সার্বিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩৬৫টি চাঁদাবাজির মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, যার পঁচাশি শতাংশেই আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে এবং মাত্র পনেরো শতাংশ মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত ও চার্জশিট দাখিলের পরও বিচারকার্য শুরু না হওয়া নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, চার্জশিট জমা পড়ার পর দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে আসামিরা সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে যান কিংবা উচ্চ আদালতে মামলা স্থগিত করে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক ভাঙচুর ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার মতো ঘটনায় চাঁদাবাজি ও দখলদারির প্রসঙ্গটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, যেসব লঘু অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারকরা পূর্বে নমনীয় ভূমিকা পালন করতেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই অবস্থান অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করা উচিত। নির্দিষ্ট তদন্তকাল পর্যন্ত আসামিদের কারাগারে আটক রাখার পাশাপাশি উচ্চ আদালতে স্থগিত থাকা চাঁদাবাজির মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
এদিকে আইনি জটিলতা নিরসনের তাগিদ দিয়ে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান বলেন, চার্জশিট দেওয়ার পর সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন ও বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধ প্রবণতা কমানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বিদ্যমান আইনে চাঁদাবাজির সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর কারাদণ্ড হলেও মৃত্যুর হুমকির মতো গুরুতর ক্ষেত্রে তা চৌদ্দ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তবে বর্তমান বাস্তবতায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং যুগোপযোগী সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন এই আইন বিশেষজ্ঞ।