তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) আনুষ্ঠানিক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ইসরায়েলের একটি বিশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় দল ও আন্তর্জাতিক আইন বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪নিউজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার চলমান চরম বৈরিতা ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই তেল আবিবের পক্ষ থেকে এই কঠোর আইনি হুঁশিয়ারি এলো।
প্রস্তাবিত এই মামলার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রধানত দুটি গুরুতর অভিযোগকে সামনে আনা হচ্ছে। প্রথমত, তুরস্কে বসবাসকারী কুর্দি সংখ্যালঘুদের প্রতি এরদোয়ানের সরকারের বিতর্কিত আচরণ এবং তাদের ওপর চালানো নিপীড়নের বিষয়টি এতে প্রাধান্য পাবে। দ্বিতীয়ত, এরদোয়ানের প্রশাসন ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে আর্থিক ও অন্যান্য উপায়ে সহযোগিতা জুগিয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগও যুক্ত করা হচ্ছে এই আইনি পদক্ষেপে। সম্প্রতি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারি প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার জন্য আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের শরণাপন্ন হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। ঠিক তার পরই ইসরায়েলের এই পালটা আইনি পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ককে এক নতুন ও বিপজ্জনক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিশ্লেഷকদের মতে, ইসরায়েল ও তুরস্কের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান দুই দেশের কূটনৈতিক অবনতির চরম রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। তবে আইনি বাস্তবতার দিক থেকে একটি বড় আইনি জটিলতা রয়ে গেছে। তা হলো—ইসরায়েল কিংবা তুরস্ক, কোনো দেশই আইসিসি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি বা রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেনি। এই বাস্তবতায় আদালতের ওপর সরাসরি কোনো বিচারিক এখতিয়ার নেই বললেই চলে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজ থেকে সরাসরি এখতিয়ার না থাকলেও তাত্ত্বিক দিক থেকে অন্য কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যম ব্যবহার করে আইসিসিতে মামলা দায়েরের বিকল্প পথ খুঁজতে পারে ইসরায়েল।
তবে আই২৪নিউজের কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তেল আবিব মূলত শেষ পর্যন্ত এই মামলা করার পর্যায়ে যাওয়ার আশা করছে না। বরং মামলার এই প্রাথমিক প্রস্তুতি ও হুমকিকে তারা এরদোয়ানের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টির একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তুর্কি প্রেসিডেন্টকে চাপে রাখাই এই উচ্চপর্যায়ের আইনি প্রস্তুতির অন্যতম প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্য।
উল্লেখ্য, গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান চলাকালে সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগে এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। সেই ক্ষত ও আন্তর্জাতিক চাপের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার তুর্কি রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের এই নতুন ফ্রন্ট খুলল নেতানিয়াহুর প্রশাসন। সময়ের আবর্তে মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরের ভূরাজনীতিতে এই আইনি হুমকি কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
সূত্র: ফার্স্টপোস্ট ও আই২৪নিউজ