মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন করে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি গুরুতর অভিযোগ করে তিনি বলেছেন যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ কিংবা সরাসরি সংঘাতের মাধ্যমে ইরানকে তাদের নতিস্বীকার করাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর এখন শত্রুপক্ষ দেশের অভ্যন্তরে সুপরিকল্পিতভাবে বিভাজন সৃষ্টির গভীর চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। তেহরান থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশটির রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর এবং প্রাদেশিক রাজধানীগুলোর মেয়র ও স্থানীয় প্রশাসনিক প্রধানদের সঙ্গে এক বিশেষ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সেই বৈঠকে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
আলোচনার একপর্যায়ে তিনি এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। পেজেশকিয়ান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, বহিরাগত শত্রুরা সামরিক যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সাধারণ মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু বা আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আর সেই ব্যর্থতার গ্লানি ঢাকতেই তারা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ধ্বংসাত্মক কৌশল বেছে নিয়েছে। বর্তমানে শত্রুরা দেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নানা অজুহাতে বিভেদ তৈরি করা এবং সেই অভ্যন্তরীণ দূরত্বকে আরও গভীর করার দিকেই তাদের যাবতীয় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে।
বর্তমান এই স্পর্শকাতর ও সংকটময় মুহূর্তে দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় জাতীয় ঐক্য এবং দৃঢ় সংহতি বজায় রাখার ওপর অত্যন্ত জোরালো গুরুত্ব আরোপ করেছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। তিনি অত্যন্ত সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, দেশের কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর নিজেদের ‘সবজান্তা’ বা সর্বেসর্বা মনে করা কোনোভাবেই উচিত নয়। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে গিয়ে দেশের অন্য কোনো অংশকে দুর্বল বা প্রান্তিক করে তোলার যে মানসিকতা, তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাহ্যিক যেকোনো ধরনের চাপ, আগ্রাসন ও গোপন ষড়যন্ত্র সফলভাবে মোকাবিলা করতে হলে দেশের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এবং ইস্পাতসম ঐক্যবদ্ধ অবস্থানই সবচেয়ে কার্যকরী এবং একমাত্র অস্ত্র বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ সুদৃঢ় ঐক্য ধরে রাখা এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ে তেহরানের টিকে থাকার এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রধান শর্ত।
গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কঠোর অবরোধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বহুমুখী সাইবার ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নানা ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে তেহরানের অমীমাংসিত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে ইরানের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে ভূরাজনৈতিক চাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি সামরিক সংঘাতের বিশাল ঝুঁকি এড়াতে এবং তেহরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী চাপ বজায় রাখতে পরাশক্তিগুলো প্রায়শই অভ্যন্তরীণ সামাজিক অসন্তোষকে উসকে দেওয়ার কৌশল নিয়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক এই সতর্কবার্তা থেকে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, তেহরান প্রশাসন অভ্যন্তরীণ যেকোনো ধরনের বিভাজন ও গোপন ষড়যন্ত্র সম্পর্কে গভীরভাবে ওয়াকিবহাল রয়েছে এবং তা যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে।
দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বৈদেশিক চক্রান্ত পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিতে স্থানীয় প্রশাসন ও শহরের মেয়রদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কার্যকর বলে মনে করেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। স্থানীয় সরকার পরিচালনার সঙ্গে জড়িত শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের জনগণের আরও কাছাকাছি যাওয়ার এবং যেকোনো ধরনের উসকানি বা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট আহ্বান জানান তিনি।
সবমিলিয়ে, বাহ্যিক সামরিক হুমকি সফলভাবে মোকাবিলা করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে তেহরান তার বর্তমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল সাজাচ্ছে, যা আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিতে অত্যন্ত দূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। (সূত্র: আল জাজিরা)