ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর দশা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং তীব্র শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপের এই দেশটি। জেন-জির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ছাত্র আন্দোলন এখন দেশজুড়ে এক বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের রূপ নিয়েছে। শ্রেণিকক্ষের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষা খাতের সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে চার শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি, বিবিসি ও বিএফএমটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
প্যারিসের আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে ‘লিসে’ বা হাইস্কুল স্তরের শিক্ষার্থীদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বর্তমানে দেশজুড়ে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্কুল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ অবরোধ করে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান এই ছাত্র আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশের অন্তত ৪০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি (যেমন প্রতি ক্লাসে গড়ে ৩৪ জন শিক্ষার্থী) থাকায় পড়াশোনার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষকরা অতিরিক্ত কাজের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন বলেও তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
মঙ্গলবার আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচিটি বেশ কিছু জায়গায় সহিংস রূপ নেয়। এ সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন শিক্ষক, বেশ কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ জন সদস্য আহত হয়েছেন। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন এবং বেশ কিছু বাসস্টপের ক্ষতিসাধন করেছেন। পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিয়ন সিন্দিকাল লিসেয়েনের সভাপতি রিয়াদ রানি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ‘দমন-পীড়ন’ ও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, চলমান বিক্ষোভে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং তাদের দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা উঠলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন যে পুলিশ অত্যন্ত সংযত ও আনুপাতিক উপায়ে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে।
ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে মৌলিক স্বাধীনতা হিসেবে স্বীকার করলেও সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। এর আগে সোমবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আরও সহিংস রূপ নিলে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন।
এদিকে কেবল শিক্ষার্থীরাই একা নন, মঙ্গলবার এই ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি দেশজুড়ে শিক্ষক, হাসপাতালকর্মী এবং সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন ইউনিয়ন কম বেতন ও প্রতিকূল কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে একযোগে কর্মবিরতি পালন করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে অন্তত দুই লাখ মানুষ অংশ নিলেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই তা সমাপ্ত হয়েছে। লিসে স্তরের শিক্ষার্থীদের এই আকস্মিক আন্দোলন ফ্রান্সের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। (সূত্র: বিবিসি, এএফপি ও বিএফএমটিভি)