মধ্য আকাশে চরম নাটকীয়তা ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরাইলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ। ককপিটের ভেতরে পাইলটদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত সহিংসতা ও ছুরিকাঘাতের মারাত্মক ঘটনার জেরে বাধ্য হয়ে বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে সেটিকে জরুরি অবতরণ করানো হয়। সৌভাগ্যবশত, উড়োজাহাজটিতে থাকা প্রায় দেড়শ যাত্রীর সবাই অক্ষত ও নিরাপদে রয়েছেন। বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম এবং বিমানে ভ্রমণকারী প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, দুবাই বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর প্রায় দুই ঘণ্টা নির্বিঘ্নেই আকাশপথ পাড়ি দিচ্ছিল বিমানটি। কিন্তু এর ঠিক পরপরই ককপিটের ভেতরে কোনো এক বিষয় নিয়ে পাইলট ও কো-পাইলটের মধ্যে তীব্র বিরোধ ও বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিলে এক পাইলট অপর পাইলটকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন বলে জানা যায়। রক্তক্ষয়ী এই আকস্মিক হানাহানির ফলে ককপিটের ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে এবং ক্রুরা উপায় না পেয়ে ককপিট থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে যাত্রীদের কাছে জরুরি সহায়তা কামনা করেন।
তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজন সাহসী যাত্রী সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে এগিয়ে যান এবং ককপিটের ভেতরে প্রবেশ করে হামলাকারী পাইলটকে জাপটে ধরে শক্তভাবে বেঁধে ফেলেন। একই ফ্লাইটে সাধারণ যাত্রী হিসেবে পেছনের আসনে ভ্রমণ করছিলেন অন্য দুই দক্ষ পাইলট। তারা দ্রুত ককপিটে প্রবেশ করে উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেন। এদিকে, উড়োজাহাজে উপস্থিত এক দন্তচিকিৎসক দ্রুত এগিয়ে এসে আহত পাইলটকে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
ইসরাইলি গণমাধ্যমের কাছে এক নারী যাত্রী তাদের রোমহর্ষক ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান যে, ককপিটে যখন এই মারামারি ও ধস্তাধস্তি চলছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই উড়োজাহাজটি অত্যন্ত তীব্র গতিতে নিচের দিকে নামতে শুরু করে। এই আকস্মিক উচ্চতা পতনে যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। ককপিটের আশপাশে তখন রক্ত ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ইসরাইলের সরকারি এক কর্মকর্তা দেশটির চ্যানেল ১২-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় মন্তব্য করেন যে, অল্পের জন্য একটি ভয়াবহ ও সুপরিসর বিমান দুর্ঘটনা বা বড় ধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেয়েছে বিমানটি।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর সংগৃহীত রাডার ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই সংকটময় মুহূর্তে বিমানটি দুই মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার ফুট বা প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার নিচে নেমে গিয়েছিল। উড়োজাহাজটির ক্রুরা প্রথমে সাধারণ জরুরি সংকেত প্রেরণ করেছিলেন। তবে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় কয়েক মিনিট পর তা পরিবর্তন করে বিমান ছিনতাইয়ের জরুরি সংকেত বা স্কোয়াক কোড পাঠানো হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে বিমানটি পুনরায় সাধারণ জরুরি সংকেতের মোডে ফিরে আসে।
সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ের ওই উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন এবং ফার্স্ট অফিসার দুজনেই এই ঘটনায় আহত হয়েছেন। তাদের দ্রুত বিমানবন্দর থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে তারা ঠিক কী কারণে বা কীভাবে এই মারাত্মক হামলার শিকার হলেন, সে বিষয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্ট কিছু জানায়নি।
এদিকে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে তাদের ফ্লাইটে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তবে উড়োজাহাজে থাকা সব যাত্রী সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন। যাত্রীদের গন্তব্যে অর্থাৎ তেল আবিবে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দুবাই থেকে দ্রুত আরেকটি বিকল্প উড়োজাহাজ সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আটকে থাকা যাত্রীদের ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে চলছে।
সূত্র: বিবিসি