রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) শাখায় তিন শতাধিক কোটি টাকার একটি পুরোনো ঋণ নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থানে চরম অসঙ্গতি ও পরস্পরবিরোধী চিত্র সামনে এসেছে। সম্প্রতি ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ইউএই কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের ঋণ অবলোপন ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ৩০৪ কোটি টাকার এই বিশাল অঙ্কের ঋণটি কি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধভাবে নিষ্পত্তি হওয়া কোনো পুরোনো বিষয়, নাকি বর্তমান অনিয়ম ও হিসাবের গরমিল ঢাকার একটি সুকৌশলী প্রয়াস?
রবিবার জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমান গণমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট দাবি করেন যে, ইউএই কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বেশ কিছু তথ্যগত অসঙ্গতি ও বিভ্রান্তি রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ খলিফা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ফাইন্যান্স মরিস’ এবং ‘মেট্রোপলিটন এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে নেওয়া এই ঋণটি অত্যন্ত পুরোনো। দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা আদায়ের নিরন্তর প্রচেষ্টা, কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক আইনগত প্রক্রিয়া এবং সালিসি কার্যক্রমের সব ধাপ সফলভাবে পার হওয়ার পর দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতিক্রমে ২০০৩ সালেই এই ঋণটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আরও পরিষ্কার করে জানায় যে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রয়াত ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ছবি ভুলবশত ব্যবহার করা হলেও, এই ঋণগ্রহীতার আসল পরিচয় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকৃত ঋণগ্রহীতা ছিলেন মূলত শেখ খলিফা বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান। ব্যাংকের দীর্ঘদিনের পুরোনো সংরক্ষিত নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালের সালিসি আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা এবং দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক সম্মতির ভিত্তিতেই ২০০৩ সালে এই ঋণের যাবতীয় দায়দেনা আইনগত উপায়ে চুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, এই নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা ব্যত্যয় ঘটেনি।
তবে জনতা ব্যাংকের এই দাবি এবং ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএইর চারটি ভিন্ন শাখায় ২৩ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা প্রায় ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা বা ২০ কোটি ৫১ লাখ দিরহাম সমপরিমাণ ঋণ সম্পূর্ণ অবলোপন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শেখ খলিফা-সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত ঋণটির পরিমাণই প্রায় ১৪ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার সমান। শুধু তাই নয়, ওই প্রতিবেদনে আরও প্রায় ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি ভিন্ন ঋণকে সম্পূর্ণ ‘ভুলক্রমে’ অবলোপন করা হয়েছে বলে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ নিষ্পত্তির বিষয়ের পাশাপাশি ইউএই শাখার সার্বিক হিসাব ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে শুধু ঋণ অবলোপন নয়, বরং ইউএই শাখাগুলোর দৈনন্দিন হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের চরম দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে শারজাহ শাখার সান্ড্রি ডিপোজিট এবং সান্ড্রি অ্যাসেটের হিসাবের মধ্যে বিশাল অঙ্কের পার্থক্য এবং দুবাই শাখার বিভিন্ন হিসাবের গরমিল বিষয়টি ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের হতবাক করেছে। এছাড়া ইউএই সিইও কার্যালয়ের ছয়টি বহুমূল্যবান ল্যাপটপের অস্তিত্ব ও ব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হলে, জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পাল্টা জবাবে জানিয়েছে যে ল্যাপটপগুলো সশরীরে বিদ্যমান রয়েছে এবং সেগুলো সম্পূর্ণ বৈধভাবে দাপ্তরিক কাজেই ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইউএই শাখায় তিনজন ভারতীয় নাগরিককে কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া প্রসঙ্গে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ওই অঞ্চলে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের স্থানীয় নিয়োগ-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো পূর্বানুমতি নেওয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল না। এছাড়া ইতালির জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি বা জেইসি এসআরএল নামের আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ না রাখার যৌক্তিকতা তুলে ধরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, প্রবাসী আলের প্রবাহ সচল রাখা এবং দেশের সার্বিক ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে চালু রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে কেবল ৩০৪ কোটি টাকার ওই পুরোনো ঋণটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবলোপন বা নিষ্পত্তি হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নটিই এককভাবে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে জনতা ব্যাংক জোর দিয়ে বলছে যে এটি সম্পূর্ণ পুরোনো ও সুদীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া একটি মীমাংসিত বিষয়, অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে একই ইউএই কার্যক্রমে বড় অঙ্কের ঋণ অবলোপন, হিসাবের গুরুতর অসঙ্গতি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের চরম দুর্বলতা রয়েছে।
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রতিবেদনে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণকে সরাসরি অবৈধ বা দুর্নীতির অর্থ বলে স্পষ্টভাবে আখ্যায়িত করা হয়নি, তথাপি ২০০৩ সালের পুরোনো নিষ্পত্তির নথিপত্র, ঋণ অবলোপনের সঠিক অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সমস্ত হিসাবরেকর্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান পর্যবেক্ষণের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন। যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এই সমস্ত পুরোনো ও নতুন নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করা হলেই কেবল প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে যে, এটি কেবল অতীতের একটি নিষ্পত্তি করা ঋণের ঘটনা মাত্র, নাকি এর নেপথ্যে ইউএই কার্যক্রমের বিশাল হিসাবের অসঙ্গতির অন্য কোনো গভীর যোগসূত্র লুকিয়ে আছে।