অর্থনীতির বর্তমান চাপ সামাল দিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণের ওপর বিশেষ ভরসা রাখছে বাংলাদেশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট, দুর্বল রাজস্ব আদায়, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং বাজেটের অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করার জোরালো চেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ সহায়তা পেতে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ১৫ দিনের দীর্ঘ সফরে ঢাকায় আসছে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল।
সফরকালে আইএমএফ প্রতিনিধিরা অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সঙ্গে পৃথক সিরিজ বৈঠকে অংশ নেবেন। এসব বৈঠকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির বিভিন্ন দিক নিয়ে নিবিড় পর্যালোচনা করা হবে। তবে মিশন ঢাকায় আসার আগেই রাজস্ব পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, নতুন করদাতা শনাক্তকরণ, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব প্রশাসনের অটোমেশনের সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ না থাকায় এনবিআরের পাঠানো প্রতিবেদনে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। ফলে প্রতিনিধিদল আসার আগেই পরিকল্পনাটি সংশোধন ও বাস্তবসম্মত করার তাগিদ অনুভব করছে অর্থ বিভাগ ও এনবিআর।
এদিকে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এজেন্ডা এবারের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, মূলধন ঘাটতি দূরীকরণ এবং আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে আইএমএফ তাদের আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট ভর্তুকি চাপ কমাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয় যৌক্তিকীকরণের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে এবং সামনে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম ও ভর্তুকি কমানোর মতো সিদ্ধান্তগুলোও আলোচনার টেবিলে আসতে পারে।
আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিকসভাকে সামনে রেখে ৪setPrototypeOf৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার নতুন ঋণ পাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কাছে বাজেট সহায়তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য আমদানি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা চাওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে নতুন চুক্তি চূড়ান্ত করা, যাতে আগামী বছরের শুরুতেই প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার চেয়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রমে গতি আনা বেশি জরুরি। এনবিআর পুনর্গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কার্যকর কৌশল না থাকলে কেবল ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটানো সম্ভব হবে না। ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যবহার হবে এবং সংস্কারের রূপরেখা কী হবে, সে বিষয়ে সরকারের আরও স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার।