সংগীত দুনিয়ায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটিয়ে চিরতরে বিদায় নিলেন আশির দশকের জনপ্রিয় মার্কিন আরঅ্যান্ডবি (R&B) গায়ক ফ্রেডি জ্যাকসন। ‘ইউ আর মাই লেডি’ এবং ‘রক মি টু নাইট’-এর মতো মনোমুগ্ধকর সব রোমান্টিক গান দিয়ে বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্তের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেওয়া এই গ্র্যামি-মনোনীত শিল্পী ৭০ বছর বয়সে মারা গেছেন।
তার পারিবারিক পক্ষ থেকে অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিবার জানিয়েছে, গত সোমবার নিজের ৭০তম জন্মদিনের ঠিক তিন দিন পর তিনি শেষ নিঃশেষ ত্যাগ করেন। তবে তার আকস্মিক এই প্রয়াণে পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
শোকবার্তায় তার পরিবার গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে উল্লেখ করেছে, ফ্রেডি কেবল একজন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও উদার মনের এক মানুষ। নিজের ভক্ত, পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সংগীতের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভালোবাসা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি আমাদের প্রেমের গল্প, জীবনের নানা উৎসব এবং সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতির নিখুঁত সাউন্ডট্র্যাক উপহার দিয়ে গেছেন। তাঁর এই সৃষ্টির অবদান চিরকাল মানুষের মনে বেঁচে থাকবে। যারা তাঁর গান শুনেছেন, নেচেছেন কিংবা কনসার্টে তাঁর সুরে কেঁপে উঠেছেন, তাদের প্রত্যেককে তিনি পরিবারের সদস্য মনে করতেন এবং তাঁদের ভালোবাসা সবসময় বুকে ধারণ করে গেছেন। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শেষকৃত্যের বিস্তারিত আয়োজন আগামী দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।
নিউ ইয়র্কের ঐতিহাসিক হার্লেম অঞ্চলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রেডি জ্যাকসনের সংগীতের প্রতি অনুরাগ শৈশব থেকেই গড়ে ওঠে। হোয়াইট রক ব্যাপ্টিস্ট চার্চে গসপেল গান গাওয়ার মাধ্যমে তিনি সংগীতের মূল পাঠ গ্রহণ করেন। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় ক্লাবগুলোতে পারফর্ম করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেন এবং সত্তরের দশকের শেষের দিকে ‘মিস্টিক মারলিন’ নামক ব্যান্ডের সঙ্গে পশ্চিম উপকূলে যান। পরবর্তীতে নিউ ইয়র্কে ফিরে এসে ১৯৮৫ সালে তিনি তাঁর বহু প্রতীক্ষিত অভিষেক অ্যালবাম ‘রক মি টু নাইট’ প্রকাশ করেন। তাঁর স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত ও হৃদয়ছোঁয়া কণ্ঠস্বরই ছিল তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। আমেরিকান রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন বা আরআইএএ (RIAA) কর্তৃক খুব দ্রুত প্ল্যাটিনাম সনদ পাওয়া এই অ্যালবামটি তাঁকে ক্যারিয়ারের প্রথম দুটি মর্যাদাপূর্ণ গ্র্যামি মনোনয়ন এনে দেয়। যার একটি ছিল সেরা নতুন শিল্পী এবং অন্যটি ‘ইউ আর মাই লেডি’ একক গানের জন্য সেরা পুরুষ আরঅ্যান্ডবি ভোকাল পারফরম্যান্স ক্যাটাগরিতে।
‘রক মি টু নাইট’ অ্যালবামটির অভাবনীয় সাফল্যের সুবাদে ফ্রেডি জ্যাকসন বিশ্ব সংগীত মঞ্চে এক নতুন আরঅ্যান্ডবি সুপারস্টারে রূপ নেন। আশির দশকজুড়ে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিলবোর্ড মিউজিক চার্ট এবং কনটেম্পরারি আরবান রেডিওর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। তাঁর অনুসারী ও ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন এক পরম আরাধ্য কণ্ঠশিল্পী। তাঁর এই সফল ধারাবাহিকতা বজায় ছিল তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবামেও। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘জাস্ট লাইক দ্য ফার্স্ট টাইম’ও প্ল্যাটিনাম অর্জনের গৌরব অর্জন করে।
সংগীতের আলোর পাশাপাশি জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি এক কঠিন স্বাস্থ্যগত লড়াইয়ের মুখোমুখি হন। ২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা এক ভিডিওবার্তায় তিনি ভক্তদের জানান যে, তিনি ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। সেই ভিডিওতে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, এই যাত্রায় অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে তিনি খোলামেলা মন এবং সাহস নিয়ে এর মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি কেবল ব্যক্তিগত গল্পের অংশ হিসেবে নয়, বরং সমাজে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে এই তথ্য সবার সাথে শেয়ার করেছেন। সেই সময়ে তিনি ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত হন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি আমাদের শরীরের রক্ত পরিষ্কার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার প্রতি সাতজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে অন্তত একজন ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং এর প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীই জানেন না যে তাদের এই মারাত্মক রোগ রয়েছে। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্ত পরিস্রাবণে সমস্যা হয়, ফলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমে হৃদরোগের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফ্রেডি জ্যাকসনের প্রয়াণে শুধু সংগীত জগৎই হারাল না একজন উজ্জ্বল রত্নকে, বরং বিশ্ব হারাল এক অনন্য সুরের জাদুকরকে।
(সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস