সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 27
প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও উন্মুক্ত জলাশয়ের অন্যতম প্রধান ফিল্টার হিসেবে পরিচিত শামুক-ঝিনুক নিধন এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন বিলে প্রতিদিন নির্বিচারে চলছে এই জলজ প্রাণী শিকারের মহোৎসব। আইনের কড়াকড়ি ও প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ী চক্রের ইন্ধনে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ ও মৎস্যজীবীরা দেদারছে ধ্বংস করে চলেছেন জলজ জীববৈচিত্র্য। ফলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও দেশীয় মাছের প্রজনন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি বছর বর্ষার মৌসুম শুরু হলেই চলনবিলের বিশাল জলরাশি থেকে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহের হিড়িক পড়ে যায়। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই চার মাস শামুক সংগ্রহের মূল মৌসুম ধরা হলেও, এ বছর দেরিতে পানি নামার কারণে সংগ্রহের সময়সীমা আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। উপজেলার কামাড়শোন, দিঘী সগুনা, কুন্দইল, মাকড়শোন, বিল-নাদো, মান্নান নগর, ঘরগ্রাম, মাগুরা বিনোদ ও হামকুড়িয়াসহ অন্তত ২০ থেকে ২৫টি দুর্গম পয়েন্টে প্রতিদিন প্রায় ৫০০টি ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে শামুক শিকারীরা মাঠে নামছেন। এসব পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন টন পর্যন্ত শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রকাশ, একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী চক্র দরিদ্র চাষি ও পেশাদার মৎস্যজীবীদের শামুক সংগ্রহের জন্য ছোট আকারের ডিঙ্গি নৌকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খাটুনি করে একেকজন সংগ্রাহক তিন থেকে চার বস্তা করে শামুক আহরণ করেন। প্রতি বস্তা শামুক বর্তমানে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় কেনাবেচা হয়। স্থানীয় মৌসুমি ব্যাপারীরা এসব শামুক কিনে ট্রাক বা অন্যান্য যানবাহনে করে খুলনা ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন মাছের খামারগুলোতে ফিশ ফিড বা মাছের খাদ্য হিসেবে সরবরাহ করে থাকেন। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল চলনবিল এলাকা থেকেই প্রতি বছর প্রায় কোটি টাকার শামুক বেচাকেনা হয়ে থাকে।
জীবিকা নির্বাহের দায়ে শামুক শিকারে নামা মোতালেব হোসেন নামে এক সংগ্রাহক জানান, বর্ষার মৌসুমে কৃষিকাজ বা অন্য কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় পেটের দায়ে তারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তা নিয়ে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। শামুক সংগ্রহ করে প্রতিদিন তাদের জনপ্রতি চারশ থেকে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত আয় হয়।
অন্যদিকে শামুক ও ঝিনুক ব্যবসায়ী আব্দুল মমিন জানান, এই ব্যবসার সঙ্গে এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছেন। বর্ষার এই তিন-চার মাস জুড়ে তাদের পাইকারি কেনাবেচা চলে। তারা স্থানীয় সংগ্রাহকদের কাছ থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিভিন্ন জেলার বড় বড় আড়তে সরবরাহ করে থাকেন।
এদিকে পরিবেশবাদীরা বলছেন, জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় শামুক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার বলেন, ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে শামুককে গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রাণী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ এই আইন পুরোপুরি উপেক্ষা করে নির্বিচারে শামুক নিধন চলছে। শামুক সংগ্রহের অপরাধে জেল ও অর্থদণ্ডের কঠোর আইনি বিধান থাকলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানো যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়ের মতো উন্মুক্ত জলাশয়ে শামুক ও ঝিনুক প্রাকৃতিকভাবে বংশবিস্তার করে থাকে। জলাশয়ের নোংরা পানি ও ক্ষতিকর পচাপোকা আহার করে এরা প্রাকৃতিকভাবে পানি বিশুদ্ধকরণ বা ফিল্টারিংয়ের কাজ সম্পন্ন করে। পাশাপাশি এটি স্থানীয় মিঠা পানির দেশীয় মাছের পুষ্টিকর প্রাকৃতিক খাদ্যের চাহিদাও পূরণ করে থাকে।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, চলনবিল অঞ্চলে অবৈধভাবে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহের বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা হবে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনে শামুক সংগ্রহকারী ও এর সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।