ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,  ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

মাকে আর দূরে যেতে দেব না: ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত গ্রাম পুলিশ সাগর


  • আপলোড সময় : সোমবার ১২ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৮:২৮ পিএম

পাবনা প্রতিনিধি 

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় মা ও ছেলের আবেগঘন পুনর্মিলনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটেছে বহুল আলোচিত এক পারিবারিক বিরোধের। আদালতের হস্তক্ষেপ ও স্থানীয় প্রশাসনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় নিজের ভুল বুঝতে পেরে বৃদ্ধা মা মুন্নি খাতুনকে আজীবন নিজের কাছে রেখে সেবার অঙ্গীকার করেছেন ছেলে সাগর হোসেন। সাগর পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের একজন গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত আছেন।


ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ৮ অক্টোবর। সেদিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে এক শুনানিতে উপস্থিত হয়ে মাকে নিজের কাছে রাখতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানান সাগর। এমনকি মাকে সঙ্গে রাখলে আত্মহত্যা করবেন বলেও মারাত্মক মন্তব্য করে বসেন তিনি। মায়ের ভরণপোষণের জন্য মাসিক কিছু টাকা দিতে রাজি হলেও বৃদ্ধা মাকে নিজের সংসারে জায়গা দিতে তিনি একেবারেই রাজি ছিলেন না। অন্যদিকে, স্বামীহারা মুন্নি খাতুন জীবনপ্রাহ্ণে ছেলের কাছেই একটু আশ্রয়ের জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন। সেদিনের সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য ও কথোপকথন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে তীব্র সমালোচনা ও আলোচনার সৃষ্টি হয়।


সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই মর্মান্তিক সংবাদটি পাবনা আদালতের নজরে আসে। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পাবনা আদালত বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মীমাংসার উদ্যোগ নেন। গত রোববার আদালত মা মুন্নি খাতুন ও ছেলে সাগর হোসেনকে তলব করেন। সাঁথিয়া থানার পুলিশের তত্ত্বাবধানে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত মা ও ছেলের দীর্ঘ বক্তব্য ও আপত্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সম্পর্কের বরফ গলাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেন। আইনি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মা-ছেলের বন্ধন ও দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিলে সাগর তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। আদালতের ভেতরেই তিনি মায়ের পায়ে ধরে ক্ষমা চান এবং বৃদ্ধা মা-ও তাৎক্ষণিকভাবে ছেলেকে ক্ষমা করে বুকে টেনে নেন।


আদালতের সুসংবাদের পর সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাগর তাঁর মাকে সঙ্গে নিয়ে সাঁথিয়ার ইউএনও সেলিম আহমেদের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত হন। এ সময় সাগরের মামা জাকির হোসেন, খালু মাসুদ রানা, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে সাগর প্রকাশ্যে তাঁর মাকে সারা জীবন নিজের কাছে রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। আবেগঘন এই মুহূর্তে মা ও ছেলে একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। উপস্থিত সবার মাঝেই তখন এক স্বস্তির আবহ তৈরি হয়।


আজ মাকে সঙ্গে নিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ে উপস্থিত হন সাগর হোসেন

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সাগর হোসেন জানান, রাগের মাথায় ও আবেগের বশে তিনি সেদিন অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করেছিলেন। তবে ইউএনও স্যার এবং আদালতের দিকনির্দেশনায় তিনি নিজের ভুল পুরোপুরি অনুধাবন করতে পেরেছেন। মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের পর থেকে গত তিন দিন অনুশোচনায় তিনি রাতে ঘুমাতে পারেননি। এখন মাকে নিজের ঘরে ফেরাতে পেরে তিনি অত্যন্ত সুখী ও স্বস্তিবোধ করছেন। আজীবন মায়ের সেবা করার অঙ্গীকার করেন তিনি।


ছেলের এমন পরিবর্তনে আনন্দিত মা মুন্নি খাতুনও। ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, পাবনা আদালত ডেকে নেওয়ার পর ছেলে সেখানেই তাঁর কাছে ভুল স্বীকার করে মাফ চেয়েছে। ছেলের প্রতি তাঁর কোনো রাগ বা অভিমান নেই। রোববার থেকেই তিনি ছেলের বাড়িতে আছেন এবং ছেলে ও ছেলের বউ তাঁর অত্যন্ত যত্ন নিচ্ছেন।


সাঁথিয়ার ইউএনও সেলিম আহমেদ জানান, ৮ অক্টোবরের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও আদালত ও প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টায় এর একটি সুন্দর সমাধান হয়েছে। মা-ছেলের মুখে হাসি ফুটায় তিনি আদালতকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং এই পরিবর্তনকে সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর