ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,  ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

তাড়াশে পুকুর খননের দৌরাত্ম্য, জলাবদ্ধতায় বিপাকে কৃষক


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৫:৫০ পিএম

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে তিন ফসলি উর্বর কৃষিজমি কেটে অবৈধভাবে পুকুর খননের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে একটি পুকুরে অভিযান চালিয়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এরপরও কোথাও অবৈধভাবে পুকুর খনন করা হলে সেখানে অভিযান চালিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বছরের পর বছর কৃষিজমি নষ্ট হওয়া ও জলাবদ্ধতায় ফসলহানির অভিযোগ তুলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।


তাড়াশ উপজেলা কৃষিপ্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানকার বিস্তীর্ণ মাঠে বছরে তিনবার বিভিন্ন জাতের ধান ও রবিশস্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবাদযোগ্য জমি কেটে পুকুর খনন এবং সেই মাটি বিক্রির প্রবণতা বেড়েছে। এতে একদিকে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।


উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম সাইফ জানিয়েছেন, অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেখানেই এ ধরনের কার্যক্রম চলবে, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হবে।


জেলা প্রশাসক ও জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, অবৈধভাবে পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩-এর সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে।


উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, তাড়াশের বারুহাস ইউনিয়নের কাজিপুর গ্রামের মো. দুদু মিয়া একটি পুকুর খনন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই পুকুর থেকে তোলা মাটি ব্যাপকভাবে বিক্রি করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে মাটি ফেলে সরকারি খাল ভরাট করা হচ্ছিল। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত শনিবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালায় প্রশাসন। অবৈধভাবে পুকুর খননের দায়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া মাটিবাহী কয়েকটি গাড়ির যন্ত্রাংশ ভেঙে দেওয়া হয় এবং মাটি কাটার এস্ককাভেটর মেশিনটি পুকুর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।


এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর তাঁদের চোখের সামনে উর্বর জমি কেটে পুকুর তৈরি করা হচ্ছে। এ প্রবণতা বন্ধের দাবিতে তাঁরা একাধিকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও কৃষক সমাবেশ করেছেন। তারপরও আগের বছরগুলোতে প্রশাসন কার্যকরভাবে পুকুর খনন বন্ধ করতে পারেনি বলে দাবি তাঁদের। এবার প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ঘোষণায় কিছুটা আশাবাদী হলেও স্থায়ী সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কৃষকেরা।


স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহিম, মোতালেব হোসেন, আরমান আলী, আব্দুস সবুর, জিল্লুর রহমান, আব্দুল কাদের, এসাহাক সরকার ও শাহালম প্রামনিক বলেন, কয়েকজন জমির মালিক হাজারো কৃষকের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা না করে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন। নির্বিচারে পুকুর খননের কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কৃষিজমিতে পানি জমে থাকছে এবং চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।


তাড়াশ সদর ইউনিয়নের মাধবপুর, মথুরাপুর, বিদিমাগুড়া, চক গোপিনাথপুর, বোয়ালিয়া ও সোলাপাড়া গ্রামের কৃষকেরা জানিয়েছেন, এসব এলাকার বিভিন্ন মাঠে দীর্ঘদিন ধরে পানি আটকে রয়েছে। অনেক জমি কচুরিপানা ও বিভিন্ন ধরনের ঘাসে ঢেকে গেছে। তাঁদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার কারণে কিছু জমিতে টানা সাত বছর ধরে কোনো ফসল আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।


এদিকে কাউরাইল ও সোলাপাড়া গ্রাম এলাকায় এখনও কয়েকটি স্থানে অবৈধভাবে পুকুর খননের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। গতকাল রোববার সরেজমিনে কাজিপুর গ্রামের দুদু মিয়ার পুকুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মাটি কাটার এস্ককাভেটর নেই। মাটিবাহী কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। এস্ককাভেটরটি পুকুর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে বিনসাড়া বাজারের পাশের একটি পরিত্যক্ত স্থানে রাখা হয়েছে।


‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’ তাড়াশ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতন অংশগ্রহণও প্রয়োজন।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, তাড়াশের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এখানকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে বছরে তিনবার বিভিন্ন জাতের ধান ও রবিশস্যের আবাদ হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি চক্র অবৈধ পুকুর খননের দায়ভার নিয়ে জমির মালিকদের এ কাজে উৎসাহিত করছে।


তিনি আরও জানান, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে তাড়াশ উপজেলায় সাড়ে চার হাজারের বেশি অবৈধ পুকুর খনন করা হয়েছে। একই সময়ে কৃষিজমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৩ হাজার বিঘা।


উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম সাইফ বলেন, গত শনিবার রাতে একটি পুকুরে অভিযান চালিয়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। খনন করা পুকুর থেকে সামান্য পরিমাণ মাটিও কাটা হলে শুধু জরিমানা নয়, জমির মালিককে কারাদণ্ড দেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান বলেন, আগের বছরগুলোর তুলনায় অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে প্রশাসন এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কৃষিজমি রক্ষায় এই অবস্থান কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।


এ সম্পর্কিত আরো খবর