দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে এক নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক ঝড়ের সাক্ষী হলো বিশ্ব। ব্যাংক ধসের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ব্যাংকে সাধারণ মানুষের আমানত আটকে যাওয়ায় তীব্র জনরোষের মুখে পড়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা। দায়িত্বে চরম অসদাচারণ ও দুর্নীতির অভিযোগে সিনেটের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাকে গৃহবন্দি রাখার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
এই নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন পেদ্রো আলিয়ানা। ৫২ বছর বয়সী আলিয়ানা দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির ৫৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করলেন। এর আগে, ২০২৩ সালে সান্তিয়াগো পেনার মেয়াদ শুরুর পর থেকেই তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, এই ব্যাংক ধসের ফলে প্যারাগুয়ের ৬০ লাখ মানুষের প্রায় অর্ধেকই তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় তোলার সমস্ত সুযোগ হারিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে পড়েছেন। শুক্রবার সিনেটে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে উপস্থিত ৪৪ জন সিনেটরের সবাই পেনাকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন। ১৯৮৯ সালে জেনারেল আলফ্রেদো স্ত্রোসনারের ৩৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের পর অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া মাত্র দ্বিতীয় প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট হলেন সান্তিয়াগো পেনা।
সিনেটের রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই প্যারাগুয়ের অন্যতম স্থিতিশীল রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। এ সময় কংগ্রেসের বাইরে জড়ো হওয়া আমানতকারী, অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক এবং জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি পরিহিত ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্যারাগুয়ের পতাকা হাতে উল্লাসে ফেটে পড়েন। তাদের কণ্ঠে ছিল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগান—‘আর কখনো স্বৈরশাসন নয়!’
এর মাত্র তিন দিন আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিতর্কিত ‘উয়েনো ব্যাংক’ জব্দ করে। এর ফলে দেশটির পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়।
আইনপ্রণেতাদের মূল অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পেনা উয়েনো ব্যাংকে সরকারি তহবিলের শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যাংকটির ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ঋণ বিতরণের বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছিল। যদিও সান্তিয়াগো পেনা তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এদিকে, রাজধানী আসুন্সিওনে নিজের বাসভবনে কঠোর পুলিশি পাহারায় গৃহবন্দি রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত পেনা। শনিবার সকালে সরকারি কৌঁসুলিদের সামনে হাজিরা দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে সেখানেই থাকতে বলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আস্থার অপব্যবহার, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সরকারি পদ ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ প্রশমিত না হওয়ায় শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা আসুন্সিওনের রাজপথে নেমে এসে তাদের আটকে থাকা সঞ্চয় ফেরত এবং ‘উয়েনো’ ব্যাংকের ব্যর্থতার জন্য কঠোর জবাবদিহিতা দাবি করেন। এই অভাবনীয় আর্থিক কেলেঙ্কারি প্যারাগুয়ের অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
সূত্র: এপি