যুদ্ধের আগুনে পুড়তে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে ফের এক মর্মান্তিক ও রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ তাইজের একটি জনবহুল বাজারে ভয়াবহ হামলায় অন্তত ৩০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। ভয়াবহ এই হামলার দায় নিয়ে এখন প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণকারী দুই পক্ষ—হুথি গোষ্ঠী এবং সৌদি সমর্থিত সরকারি প্রেসিডেন্সিয়াল পরিষদ। একে অপরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তীর ছুড়ছে তারা, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি এবং এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার শিকার হওয়া বাজারটির অবস্থান তাইজের আল-ওয়াজিয়া শহরে, যা বর্তমানে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন। পুরো ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে হুথিরা। এর বিপরীতে পাল্টা প্রতিরোধ ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকার, যারা মূলত দেশের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। দুই পক্ষের এই তীব্র ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সংঘাতময় তাইজ প্রদেশ।
রক্তক্ষয়ী এই হামলার পর থেকেই দুই পক্ষ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দাবি করে আসছে। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল ও রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণকারী হুথি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আনিস আল-আসাবাহি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের শত্রু বিমান বাহিনী আল-ওয়াজিয়া শহরের ওই বাজারে একের পর এক নৃশংস হামলা চালিয়েছে। হুথিদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বর্বরোচিত হামলায় ৩০ জন নিহত এবং অন্তত ৮ জন আহত হয়েছেন। বর্তমানে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলের ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মরদেহের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে, ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারি দাবি করেছেন যে, শুক্রবার সৌদি আরবের খামিস মুশাইত ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা একটি যুদ্ধবিমান থেকে এই হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে, হুথিদের এই সমস্ত দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে সরকারি পক্ষ। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল সরকারের সেনাবাহিনী ও তাইজের প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি কোনো সৌদি বিমান হামলা ছিল না; বরং হুথি বিদ্রোহীরাই পরিকল্পিতভাবে বাজারটি লক্ষ্য করে মারাত্মক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই ভয়াবহ আক্রমণকে পরিষ্কার ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তাইজের প্রাদেশিক সরকার।
দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকার পর গত জুলাই মাস থেকে ইরান-সমর্থিত হুথি এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারের মধ্যকার এই নতুন সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। তখন থেকেই সৌদি আরব নিয়মিতভাবে হুথিদের বিভিন্ন অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে, আর হুথিরাও তেলসমৃদ্ধ সৌদি ভূখণ্ডে হামলার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই চলমান সংঘাতের মধ্যেই সংঘাতের মাত্রা আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।
(সূত্র: এএফপি ও এনডিটিভি)