মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা চরম উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন সামরিক হামলার আশঙ্কায় নিজেদের সামরিক শক্তি সুরক্ষিত করতে অভাবনীয় তৎপরতা শুরু করেছে ইরান। দেশটির অন্তত দুটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাটির কাছে ব্যাপকভাবে চলছে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। একইসঙ্গে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলো মেরামতের কাজও পুরোদমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে পাওয়া নতুন স্যাটেলাইট চিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ থেকে এই চাঞ্চল্যকর সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমএআইএআর-এর নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা নভেম্বরে ধারণ করা এসব স্যাটেলাইট ছবি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তাঁদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, রাজধানী তেহরানের কাছাকাছি অবস্থিত কারাজের গারমদারেহ সামরিক ঘাঁটি এবং দেশের উত্তরাঞ্চলের শাহরৌদ ঘাঁটিতে বড় ধরনের খননকাজ ও নতুন নতুন ভবন নির্মাণের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এর পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্স ও গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিসহ দেশটির আরও অন্তত ১২টি সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনায় দ্রুতগতিতে সংস্কার ও মেরামতের কাজ চলছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ইরাক সীমান্তের নিকটবর্তী পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির যে ভবনগুলো বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, সেগুলোতে ইতিমধ্যেই নতুন ছাদ তৈরি করে সুরক্ষিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাজধানী তেহরানের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স থেকে ধ্বংসাবশেষ ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একের পর এক বিমান হামলার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ইরান বারবার তাদের এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করে সামরিক প্রস্তুত বজায় রাখছে।
ইরান বিষয়ক গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র সাবেক বিশ্লেষক জিম ল্যামসন এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, শাহরৌদের কাছাকাছি যে বড় আকারের খননকাজ দেখা যাচ্ছে, তা মূলত নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্যেই করা হতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাহরৌদ সংলগ্ন বিমানঘাঁটিটি একাধিকবার শত্রুভাবাপন্ন শক্তির প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) এখন তাদের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রগুলো মাটির গভীরে স্থানান্তর করার কৌশল বেছে নিচ্ছে।
এমএআইএআর-এর একজন বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষক এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, সম্ভাব্য বা ভবিষ্যতের যেকোনো বিমান হামলা থেকে সামরিক পরিকাঠামো রক্ষা করার কৌশল হিসেবে ইরান বর্তমানে সমস্ত মূল পরিকাঠামো ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে।
একই মত পোষণ করেছেন আয়ারল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আইরিশ সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান মার্ক মেলেত। তিনি বলেন, মাটির নিচে বা ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা নির্মাণের একটি বড় কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। এতে করে বাইরের পর্যবেক্ষণ সংস্থা বা শত্রু রাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের পক্ষে ঘাঁটিগুলোর আসল পরিধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া কারাজ ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্রে একাধিক সামরিক যানবাহনের অবস্থান ও আনাগোনা পরিলক্ষিত হয়েছে। একইসঙ্গে পার্শ্ববর্তী বিমানঘাঁটিতেও ব্যাপক উন্নয়নমূলক ও অবকাঠামোগত সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
(সূত্র: বিবিসি)