ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬,  ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নকশা বহির্ভূত ভবন রক্ষা ও নজিরবিহীন রাজউক দুর্নীতি প্রটোকল ভেঙে জনতার সাগরে হেঁটে মানিক মিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্র করে গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমানো যাবে না: প্রধানমন্ত্রী রিমান্ড শেষ: তাহসিফ হত্যা মামলায় কারাগারে দীপ নবাবগঞ্জে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে পুকুরপাড়ে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৬৭৪ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বগুড়া খাদ্য অফিসে বহাল তবিয়তে শহিদুল কুমিল্লায় বছরে ১২০টি হত্যাকাণ্ড, অপরাধের ঊর্ধ্বগতিতে চরম উদ্বেগ ৭ নভেম্বরের আদর্শ ধারণ করেই ২০২৪-এর বিপ্লব সফল হয়েছে: রিজভী গ্রাম পুলিশদের বেতন বৃদ্ধি ও নতুন সুযোগ-সুবিধার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্নায় খাবারে মিশছে বিষাক্ত সিসা


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ সময় : ১২:৩৭ পিএম

নতুন কেনা চকচকে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে হয়তো পরিবারের জন্য নিশ্চিন্তে রান্না করছেন পছন্দের খাবার। কিন্তু অজান্তেই সেই খাবারের সাথে আপনার ও আপনার পরিবারের শরীরে ঢুকে পড়ছে নীরব ঘাতক সিসা। বাংলাদেশে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) যৌথ গবেষণায় এ চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।


গবেষণাটি গত ২৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সিসার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হলেও ক্ষয়ে যাওয়া পুরোনো পাত্রগুলোও ঝুঁকিমুক্ত নয়। এই সিসা খাবারে মিশে জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করছে।


গবেষণায় মোট ২৭টি পাত্র পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবারের ব্যবহৃত সাতটি পুরোনো এবং স্থানীয় একজন বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র ছিল। নতুন পাত্রে প্রথমবার ভাত রান্নায় প্রতি কেজি শুকনা ভাতে গড়ে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। কয়েকবার ব্যবহারের পর খাবারের সিসার পরিমাণ কিছুটা কমলেও তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে থেকে যায়। এছাড়া ব্যবহৃত পুরোনো পাত্রে রান্না করা ভাতেও সিসা মিলেছে, যার ঘনত্ব ছিল প্রতি কেজিতে ১০৫ ও ১৫০ মাইক্রোগ্রাম।


গবেষণার সাথে যুক্ত আইসিডিডিআরবির গবেষক ডা. মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে পাওয়া যায় এমন প্রায় সব ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ির ধরন বিবেচনা করে পরীক্ষা করা হয়েছে। নতুন ও পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া পাত্র—উভয় ক্ষেত্রেই সিসার উপস্থিতি মিলেছে। গবেষণাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, সিসাযুক্ত পাত্র থেকে রান্না করা খাবারে সিসা চলে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) খাদ্যে সিসার সামান্যতম উপস্থিতিও গ্রহণযোগ্য মনে করে না। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ৩৫ লাখের বেশি মৃত্যুর কারণ সিসার সংস্পর্শ, যার প্রধান কারণ হৃদ্‌যন্ত্রের রক্তনালির ওপর সিসার ক্ষতিকর প্রভাব। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) শিশুদের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে প্রতি কেজিতে সিসার সর্বোচ্চ মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম নির্ধারণ করেছে।


গবেষকেরা পাত্র পরিষ্কার ও রান্নার পদ্ধতির ওপরও নজর দিয়েছেন। নতুন পাত্র শক্ত স্টিলের তারের জালি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করার পর সিসা নির্গমনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, যা ঘষে পরিষ্কার না করা পাত্রের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। এছাড়া রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমনের পরিমাণ বাড়ে।


আইসিডিডিআরবির আরেক গবেষক মো. মুসা বাকের বলেন, গবেষণায় শুধু ভাত ও খিচুড়িতে সিসার উপস্থিতি দেখা হয়েছে। তবে টকজাতীয় খাবার রান্না করলে সিসা বেশি নির্গমন হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক। দেশের গ্রামীণ শিশুদের ভাত খাওয়ার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা মডেল তৈরি করে দেখিয়েছেন, নতুন পাত্রে রান্না করা ভাত থেকে শিশুরা এফডিএর নির্ধারিত দৈনিক নির্দেশক মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে।


দেশে অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সিসার ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও পণ্যগুলোর মান দেখার সরকারি তৎপরতা নগণ্য। গত বছর আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের প্রায় শতভাগ শিশুর শরীরে উদ্বেগজনক মাত্রায় সিসা আছে। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কেবল অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের গুণাগুণ দেখে। তিন মাস আগে অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার সামগ্রী অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।


বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) মো. আলাউদ্দিন হুসাইন বলেন, বৈঠকের পর আমরা অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের মান দেখার বিষয়ে সচেষ্ট হয়েছি। খুব দ্রুতই বাজারে অভিযান শুরু করতে চাই। এর আগে বিএসটিআই নির্মাতাদের ডাকলেও তাদের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।


শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, মনোযোগ ও আচরণে সিসা বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিশিষ্ট শিশু রোগবিশেষজ্ঞ আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, সিসা রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি ও উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে। সিসা শরীরে প্রবেশের পর রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি ও হাড়ে পৌঁছাতে পারে। হাড়ে জমে থাকা সিসা দীর্ঘদিন পরও আবার রক্তে প্রবেশ করতে পারে। প্রতিদিন খাবার থেকে অল্প করে সিসা গ্রহণ জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির বার্তা দেয়।


গবেষকেরা বলছেন, সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে রান্নার পাত্র তৈরিতে ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ ধাতুর উৎস ও মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারে বিক্রি হওয়া পাত্রে সিসার পরীক্ষা এবং খাদ্য-সংস্পর্শে আসা সামগ্রীর জন্য কার্যকর মানদণ্ড প্রয়োজন। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে নতুন পাত্র কেনার পর কয়েকবার রান্না করে নেওয়া, শক্ত তারের জালি দিয়ে ঘষাঘষি এড়িয়ে চলা এবং কাঠের খুন্তি ব্যবহার কিছুটা সহায়ত করতে পারে, তবে তা পুরোপুরি নিরাপদ হওয়ার নিশ্চয়তা নয়।


এ সম্পর্কিত আরো খবর