রফিকুল ইসলাম রাজু
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে (আমদানি কমপ্লেক্স) আজ দুপুরে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। এ পর্যন্ত ২০টি ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সূত্রের দাবি, বিপুল পরিমাণ মালামাল ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পাশাপাশি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদেরও সজাগ অবস্থান নিতে হয়েছে।
কার্গো ভিলেজ সাধারণত আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি বিমানবন্দর এলাকায় এমন একটি স্থাপনা যেখানে পণ্য পৌঁছানোর পর শুল্কায়ন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। সাধারণ যাত্রী টার্মিনাল দিয়ে যাতায়াত করেন, কিন্তু পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্পূর্ণ আলাদা। শুল্ক বিভাগ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বিমান সংস্থা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়া কোনও পণ্য খালাস হয় না।
কার্গো ভিলেজে আমদানি-রপ্তানির পণ্য রাখা হয় যাতে শুল্কায়ন ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। স্থলপথ, সমুদ্রপথ ও আকাশপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আকাশপথে তুলনামূলকভাবে কম ওজনের মেশিনপত্র, তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক পণ্য, শাকসবজি ও পচনশীল পণ্য রপ্তানি বা আমদানি করা হয়। ডিএইচএলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশে এ ধরনের পণ্য পৌঁছে।
শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে পণ্য কার্গো ভিলেজ বা কমপ্লেক্সে অবস্থান করে। পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণের সময়কাল বিভিন্ন ধরনের পণ্যের উপর নির্ভর করে। পচনশীল পণ্য যেমন শাকসবজি, ফলমূল সাধারণত ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খালাস হয়, কিন্তু তৈরি পোশাক বা বড় আকারের ইলেকট্রনিক পণ্য বিমানযোগে দ্রুত প্রেরণের জন্য কয়েকদিন পর্যন্ত ভিলেজে রাখা হয়। কার্গো বিমানে স্থান সীমিত থাকায় রপ্তানিমুখী কিছু চালান কয়েকদিন অপেক্ষমাণ থাকে। এ সময় পণ্য ভাড়া দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।
অগ্নিকাণ্ডের ফলে কার্গো ভিলেজে রাখা পণ্যগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিমা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেলেও এতে সময় লাগে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ বোঝা যাবে এবং কার্গো ভিলেজ পুনরায় চালু হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হবে।
আকাশপথে পণ্য পরিবহনকারী আরএমকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুজ্জামান ইবনে আমিন সোহাইল বলেন, "এ ঘটনায় আমদানিকারকদের বড় ক্ষতি হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বোঝা যাবে কোন কোন পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমা দাবিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন আমদানিকারক জানান, তাদের নমুনা পণ্যও কার্গো ভিলেজে আছে, যা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দরে এ ধরনের আগুন লাগার ঘটনা গুরুতর। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগার বিষয়টি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এ ধরনের ঘটনা বিমানবন্দর সুরক্ষা মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কার্গো ভিলেজে সাধারণত আমদানি-রপ্তানির সব ধরণের দলিলপত্র, শুল্কায়ন অফিস, বিমান সংস্থা ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি অফিস থাকে। পণ্য আমদানি-রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়া এখান থেকে সম্পন্ন হয়। আগুন লাগার ফলে শুধু পণ্যই নয়, সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, সংরক্ষিত তথ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় বর্তমানে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা জানান, ২০টি ইউনিট কাজ করছে, তবে আগুনের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লেগেছে। এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ও প্রস্তুতির অপ্রতুলতার প্রমাণ দিচ্ছে।
কার্গো ভিলেজে অবস্থানকারী আমদানিকারকরা আগুনের কারণে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেক পণ্য বিমা করা হলেও ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। এতে ব্যবসায়িক লজিস্টিক ও সরবরাহ চেইনে বিলম্ব ঘটবে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য ও দ্রুত চালান প্রেরণের জন্য তৈরি পোশাক ও ইলেকট্রনিক পণ্য বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলেও সম্পূর্ণ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত হওয়ার পরেই পুনরায় কার্গো ভিলেজ সচল করা হবে।
আকাশজমিন / আরআর