পুলিশে পদোন্নতি ও বদলির তদবির বিষয়টি এতটাই গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা আজ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সভাতেও ওঠে। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, উপদেষ্টা পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমকে নির্দেশ দেন, যেকোনো তদবিরকারী কর্মকর্তাকে পদোন্নতি বা বদলির ক্ষেত্রে ধরা হবে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নিজেই বিভিন্ন পদে পদোন্নতি ও বদলির জন্য তদবির পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। এছাড়া আইজিপি বাহারুল আলমও স্বীকার করেন যে, তার কাছেও তদবির আসে। এসময় উপদেষ্টা আইজিপিকে নির্দেশ দেন, “যে কর্মকর্তা তদবির করবে, তাকে পদোন্নতি বা বদলিতে অনুমতি দেওয়া যাবে না, কারণ এই কর্মকর্তারাই আবার রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গিয়ে ধরনা দেয়।”
সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, পদোন্নতি বা বদলির বিষয়ে অনুরোধ আসে, তবে এগুলো পুরোপুরি পুলিশের নিজস্ব বিষয়। তিনি বলেন, যারা তদবিরের অনুরোধ পান, তারা যেন সাংবাদিকদের জানান যে এটি পুলিশের কাজ, এবং সিদ্ধান্ত নেবে পুলিশই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২১ অক্টোবর পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার ৮০ জন কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে পদোন্নতি পান। এই পদোন্নতি পৃথক তিনটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। পদোন্নতি প্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন: পরিদর্শক (নিরস্ত্র) ৩৩ জন, পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন) ১৮ জন এবং পরিদর্শক (সশস্ত্র) ২৯ জন। এছাড়া কনস্টেবল থেকে এএসআই পদেও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। মূল অভিযোগ হল, তদবিরের মাধ্যমে কনস্টেবল থেকে এএসআই ও পরিদর্শক থেকে এএসপি পদে পদোন্নতি ও বদলির চেষ্টা।
উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, “যদি কেউ টাকা খেয়ে বদলি করান, গণমাধ্যম নির্ভয়ভাবে লিখুক। বদলি-বাণিজ্য বন্ধ করতে পারলে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা সম্ভব।” নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আপত্তি আসেনি, এটি আগেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই এলাকায় আগে থেকেই সমস্যা ছিল। এখনো কিছু ঘটনা ঘটছে, তবে আগের তুলনায় অনেক কম। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বুলেটপ্রুফ গাড়ি দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আপনি চাইলে আপনাকেও দেওয়া হবে।”
সভায় মোবাইল সিমের ব্যবহারের সীমা কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। বর্তমানে একজন ব্যবহারকারী ১০টি সিম নিবন্ধন করতে পারেন। এটি কমিয়ে ৫টি করা হবে। উপদেষ্টা জানান, “নির্বাচনের আগে সিমের সংখ্যা কমানো হচ্ছে, কারণ একজনের সিম ব্যবহার করে অপরাধ করলে প্রকৃত দোষী ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে।”
সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনি, পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম, বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এই সভা পুলিশের পদোন্নতি ও বদলির তদবির বন্ধ করার পাশাপাশি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের নিশ্চয়তা দেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে পুলিশ প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের প্রতিরোধের বার্তা হিসেবে এই সভা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আকাশজমিন / আরআর