পুলিশের ওপর হামলা চলতে থাকলে জনগণকে নিজেদের ঘরবাড়ি নিজেরাই পাহারা দিতে হবে বলে সতর্ক করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তিনি বলেন, “অনেক কষ্টের ফলে পুলিশের মনোবল ফিরে এসেছে। আবার পুলিশের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করবেন না। তাহলে ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ের মতো বাঁশের লাঠি হাতে রাত জেগে বাড়িঘর পাহারা দিতে হবে।”
বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) সকালে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সাইবার সাপোর্ট সেন্টার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, “পুলিশ যখন কোনও অরাজকতা ঠেকানো বা প্রতিহত করার চেষ্টা করছিল, তখন আমার অফিসারদের সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। যারা এই ধরনের ব্যবহার করেন, তাদের অনুরোধ করবো—এই আচরণ করবেন না। আমরা আপনাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চাই না। আমরা জনগণের সেবা দিতে চাই।”
পল্লবীতে ককটেল নিক্ষেপ করে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে আহত করার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “গতকাল রাতে আমার একজন অফিসারকে ককটেল মেরে আহত করা হয়েছে। তিনি নিরপরাধ ছিলেন, থানার সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন নিরপরাধ মানুষকে যারা আক্রমণ করছে, তারা শুধু পুলিশ নয়, নিজেদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ফেলছে। এতে অফিসারদের মনোবল দুর্বল হয়, যার পরিণতি সবাইকে ভুগতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর ৮০ বছরের বৃদ্ধ লোককেও বাঁশের লাঠি নিয়ে মহল্লায় পাহারা দিতে হয়েছিল। যদি আবার আমাদের অফিসারদের মনোবল ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে জনগণকেই আবার সেই বাঁশের লাঠি হাতে রাস্তায় পাহারায় নামতে হবে। যারা ককটেল মেরে পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করছেন, তাদের অনুরোধ করছি—দয়া করে এসব বন্ধ করুন। আমরা সবাই মিলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই।”
ডিএমপি কমিশনার বলেন, “ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অভ্যুত্থানের পরে খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। জনগণের সহযোগিতা এবং পুলিশ সদস্যদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আমরা সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। পুলিশ অফিসাররা এখন মনোবল ফিরে পেয়েছেন। এই মনোবলকে ভেঙে দিতে কেউ যেন চেষ্টা না করে—এটাই আমার অনুরোধ।”
সম্প্রতি এক বেতার বার্তায় গাড়িতে অগ্নিসংযোগ বা ককটেল নিক্ষেপ করতে এলে ‘গুলি করার নির্দেশ’ দেওয়ার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “নাশকতা করলে গুলি করার বিধান পুলিশ আইনেই রয়েছে। কেউ ককটেল মেরে নাশকতা করলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা আমাদের দেওয়া আছে।”
একই অনুষ্ঠানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “বিশ্বে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, অপরাধের ধরনও দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। সাইবার জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল হয়রানি, মানহানি—এসব অপরাধ মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা ও মানসিক শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলছে। এর সঙ্গে অনলাইন গ্যাম্বেলিং যোগ হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। অনলাইন গ্যাম্বেলিংয়ের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার সাপোর্ট সেন্টার ভবিষ্যৎ সাইবার নিরাপত্তার একটি বড় পদক্ষেপ। এখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসুবিধাসম্পন্ন ল্যাব, দক্ষ তদন্তকারী দল, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং ২৪ ঘণ্টা সাপোর্ট টিম থাকবে। নাগরিকদের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ, বিশ্লেষণ এবং সমাধানই এই সেন্টারের লক্ষ্য। প্রযুক্তিনির্ভর, সময়োপযোগী এবং প্রমাণভিত্তিক পুলিশি সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।”
তিনি আরও বলেন, “এই সাইবার সাপোর্ট সেন্টার শুধু অপরাধ তদন্তকেই সহজ করবে না, বরং মানুষ আরও আস্থার সঙ্গে পুলিশের কাছে আসতে পারবে। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইনে যারা হয়রানি বা প্রতারণার শিকার হন, বিশেষ করে নারী ও কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।”
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব নয়—এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। সবাই সচেতন হলে সাইবার অপরাধ অনেকটাই কমে যাবে। সন্দেহজনক কিছু দেখলে পুলিশকে জানান। নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করা জরুরি।”
তিনি শেষে বলেন, “আসুন আমরা একসঙ্গে নিরাপদ শহর, নিরাপদ সাইবার স্পেস ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিই।”
আকাশজমিন / আরআর