রাজধানীর একটি হোটেলে শনিবার থেকে শুরু হয়েছে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৫’। উদ্বোধনী দিনে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, বিচার বিভাগ ব্যর্থ হলে দেশের কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। তাঁর মতে, বর্তমান সংবিধান ত্রুটিপূর্ণ হলেও সেটিই বিচার বিভাগের বৈধতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি।
প্রধান বিচারপতি বলেন, জুলাইয়ে দেশে ঘটে যাওয়া নাগরিক জাগরণ ছিল বিরল স্বচ্ছতার একটি মুহূর্ত, যা সংবিধানের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ককে পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি করে। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পুনর্গঠনের এমন সময়ে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি— কীভাবে পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে সংবিধানের মৌলিক চেতনা অটুট রেখে এগিয়ে যাওয়া যায়।
তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগের বাড়াবাড়ি, জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক আইন, কিংবা বিচার বিভাগের সীমা লঙ্ঘন— প্রতিটি ক্ষেত্রেই আদালতকে অপরিবর্তনীয় কিছু নীতির শরণাপন্ন হতে হয়। এগুলো হলো ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচারিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব। এই নীতিগুলোই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক জীবনকে টিকিয়ে রাখে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি বিচার বিভাগ নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে কোনো সংস্কারই স্থায়ী হবে না— যত প্রশংসিতই হোক না কেন।
উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের এই সময়ে বহু দেশ নিজেদের কৌশলগত অবস্থান বেছে নিতে তৎপর, তবে বাংলাদেশের উচিত প্রথমে “সঠিক পথ” বেছে নেওয়া। তিনি জানান, বাংলাদেশ নিষ্ক্রিয় করিডোর হতে চায় না; বরং একটি সক্রিয়, আত্মবিশ্বাসী, সার্বভৌম ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করতে চায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে অংশীদারিত্বে থাকবে এবং প্রয়োজনে দৃঢ় অবস্থান নেবে। জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে সবসময় উৎপাদনশীল ভূমিকা পালন করবে দেশটি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার অনুষ্ঠানে বলেন, গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপসরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় ইইউ শক্ত কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং অবাধ নির্বাচনকে সমর্থন করছে। তিনি উল্লেখ করেন, কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ এসেছে, আর এর জন্য গণতন্ত্রে বিনিয়োগ জরুরি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান অনুষ্ঠানে বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো ভারতের আইনি বাধ্যবাধকতা। তিনি মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। যদি বাংলাদেশ ভারতের কিছু ভিন্নমতাবলম্বীকে আশ্রয় দিয়ে ফেরত না পাঠাতো— তখন ভারতের প্রতিক্রিয়া কী হতো, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, এলডিসি মর্যাদা ধরে রাখার চিন্তা এখন পুরোনো। তিনি মনে করেন, বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে, ফলে বাংলাদেশের উচিত উদীয়মান বাজারগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া। বিশেষ করে ভারত ও চীনের সুবিধাজনক বাজার বাংলাদেশ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। ভারত ২০১০ সাল থেকেই বাংলাদেশের বেশিরভাগ পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে, চীনও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একই সুবিধা দিয়েছে— কিন্তু রপ্তানির বৈচিত্র্য এখনো সৃষ্টি হয়নি।
রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদেশের নীতি–প্রণেতাদের আরও গতিশীল হতে হবে এবং বেসরকারি খাতকে হতে হবে আরও উদ্ভাবনী। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সাড়ে সাতশ থেকে আটশ কোটি ডলারের হলেও রাজনৈতিক কারণে তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, যা অর্থনৈতিক নয় বরং রাজনৈতিক জটিলতার ফল।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত দেড় দশকে উন্নয়নের যে বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, তার মাধ্যমে তিন গোষ্ঠী— রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলা— সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। এ তিন গোষ্ঠীর একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে ওঠায় ব্যাংক, বিদ্যুৎসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে যায়। সাম্প্রতিক কাজের ভিত্তিতে তিনি বিষয়টিকে "সংস্কারের সঙ্গে রোমান্স" হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন— এ তিনটি লক্ষ্য পরস্পর সংযুক্ত এবং এর কেন্দ্রে রয়েছে সংস্কার। ফলে জাতি হিসেবে অগ্রগতি ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, সামাজিক মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ঘৃণা, বিভ্রান্তি ও মিথ্যার বিস্তারকে অর্থায়ন করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি। তিনি বলেন, যত বেশি মিথ্যা, ঘৃণা বা উসকানিমূলক পোস্ট— তত বেশি ক্লিক, আর তত বেশি আয়। এ প্রবণতা মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই এখন সময়ের দাবি।
তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ৮৫টি দেশের ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দেবেন বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। চিন্তাবিদ, কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের এই সমাবেশে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনীতি, গণতন্ত্র, সাংবিধানিক কাঠামো, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি— এসব বিষয়ে গভীর আলোচনা হবে।
আকাশজমিন / আরআর