আগুনে সর্বস্ব হারিয়ে হতবিহ্বল আইরিন পাশের একটি অক্ষত দোকানে বসে ছিলেন। তার মুখে এখনও গভীর ট্রমার ছাপ। গালে হাত দিয়ে স্থবির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা আইরিনের অবস্থা যেন রাতের ভয়াবহতার কথা স্পষ্ট করে বলছিল। চারদিকে পোড়া গন্ধ, ছাই হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাকে আরও ভীত করে তুলেছে।
পাশেই সেলাই মেশিনের টেবিলের ওপর কাপড়ের থান দিয়ে বালিশ বানিয়ে ঘুমিয়ে আছে আড়াই বছরের ছেলে আইমান। আগুনে তাদের চারটি কক্ষ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। পরিবারটি এখন একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আইরিন ভাঙা কণ্ঠে বলেন, “এখন কোথায় যাবো? একটি কাপড়ও বাঁচাতে পারিনি। বাচ্চাটাকে কীভাবে আগলে রাখবো?”
আইরিনের শ্বশুর আব্দুর রশিদ বলেন, তিনি যখন খবর পান, তখন আর ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। সকালে এসে দেখেন চারদিকে ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি বলেন, “আমাদের ঘরের প্রতিটি জিনিস—টেবিল, আলমারি, বিছানার চাদর, কাপড়, এমনকি ছোট আইমানের খেলনাও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বহু বছর ধরে সঞ্চয় করে যা সংগ্রহ করেছি সবকিছু শেষ।”
প্রতিবেশী রাজিব হোসেন জানান, চোখের পলকেই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে ছোট একটি আগুন দেখা গেলেও মুহূর্তেই পুরো ঘর লেলিহান শিখায় গ্রাস করে। তিনি বলেন, “চারদিক ধোঁয়া আর আগুনে অন্ধকার হয়ে আসে। তখন আর কিছু বাঁচানোর সুযোগ ছিল না। প্রাণ বাঁচাতে সবাই বাইরে ছুটে আসি। এত দ্রুত সব শেষ হয়ে যাবে—কেউ ভাবতে পারেনি।”
ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এলাকা ঘিঞ্জি হওয়ায় ও শুষ্ক মৌসুমের কারণে আগুন দ্রুত শতাধিক ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু সরু পথ, যানজট এবং পানির অভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে চরম বেগ পেতে হয়। এলাকার লেক থেকে পাইপ টেনে এনে পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
আকাশজমিন / আরআর
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বস্তির বিভিন্ন বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তদন্তের পর সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।
তিনি আরও বলেন, আগুন লাগার ৩৫ মিনিট পর প্রথম ইউনিট সেখানে পৌঁছায়। যানজটের কারণে দেরি হয়েছে। পরে আরও ইউনিট আসলেও বড় গাড়িগুলো সরু রাস্তা দিয়ে ঢুকতে পারেনি। সীমাবদ্ধতা নিয়েই কাজ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা পৌঁছানোর আগেই আগুন ডেভেলপ স্টেজে চলে যায়। তাই নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশি সময় লেগেছে।”
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন সম্পূর্ণ অসহায়। থাকার জায়গা নেই, খাবার নেই, পোশাক নেই। স্থানীয়রা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা দিতে শুরু করেছে, তবে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া শতশত পরিবার এখন সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে। আগুনে হারানো সংসার কীভাবে পুনর্গঠন হবে—সেই দুশ্চিন্তায় পুড়ছে আইরিনের মতো অগণিত মানুষ।