যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের আবেদন ক্রমবর্ধমান। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রত্যাখ্যানের হার। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনও দেশে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করলে এই হার বেড়ে যায়। এছাড়া তরুণদের বেকারত্বের কারণে বিদেশে আশ্রয় চাওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আশ্রয় আবেদন করছেন, ফলে প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীরা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের শীর্ষে বাংলাদেশ
যুক্তরাজ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ১ লাখ ১০ হাজার ৫১ জন আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। শীর্ষ পাঁচ দেশের নাগরিকরা—পাকিস্তান, ইরিত্রিয়া, ইরান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ—যা মোট আবেদনকারীর ৩৯ শতাংশ। ২৭ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন বিভাগ এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
২০০৪-২০২০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ২২ থেকে ৪৬ হাজার লোক যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতেন। ২০২১ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরটি রেকর্ডে সর্বোচ্চ, যা ১৯৭৯ সালের তুলনায় এবং ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
ইউকে বর্ডার কন্ট্রোল জানিয়েছে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীরা বেশিরভাগই ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন। অভিবাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পরে ভারতসহ এই নাগরিকরা ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ওয়ার্ক এবং স্টাডি ভিসার মাধ্যমে প্রবেশ করেছে।
ইউরোপে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়
ভেনেজুয়েলা ও আফগানরা ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আশ্রয় প্রার্থীদের বৃহত্তম গোষ্ঠী। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশের নাগরিকরা আশ্রয় আবেদনকারীদের তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী। ওই মাসে ২ হাজার ৭৩৫টি আবেদন জমা পড়েছে, যা গত বছরের জুনের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৫৫০ জন বাংলাদেশি প্রথমবারের মতো আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের সফলতার হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ৪৫ হাজার ১২৯টি আবেদন নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষমাণ ছিল।
ফ্রান্স, ইতালি এবং গ্রিসে আবেদন নিষ্পত্তির হার বাড়ায়, এতে ধারণা করা হচ্ছে, আবেদন নিষ্পত্তি দ্রুত হলে বাংলাদেশিদের ফেরত আসাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
জাতিসংঘের তথ্য: বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বৃদ্ধি
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিদেশে আশ্রয় প্রার্থী বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
শুধু ২০২৪ সালে ২৮ হাজার ৪৭৩ জন বাংলাদেশি জাতিসংঘে শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। একই বছরে ১ লাখ ৮ হাজার ১৩১ জন বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন, মূলত ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, জর্জিয়া, সাইপ্রাস, বসনিয়া ও অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশিরা আশ্রয় আবেদন করেছেন। আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর ও পাপুয়া নিউগিনিতে আবেদন হয়েছে। এশিয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, হংকং, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে আবেদনকারীরা নিবন্ধিত।
পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়ায় ২০২৪ সালে ছয় জন বাংলাদেশি শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।
আবেদন ও প্রত্যাখ্যানের কারণ
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সীমিত অভিবাসন ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আশ্রয় আবেদন বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে বিদেশে আশ্রয় চাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। ইউরোপে মানবাধিকারভিত্তিক সুযোগ থাকায় অনেকে তা ব্যবহার করে, আবার কেউ কেউ অপব্যবহারও করেন।
বাংলাদেশে তরুণ কর্মশক্তি বেশি কিন্তু চাকরির সুযোগ কম। মধ্যম আয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েরা দেশে প্রতিযোগিতায় এগোতে পারছে না, তাই অন্য উপায়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “স্টুডেন্ট ভিসাও কঠোর, কেউ কেউ শেষ হলে যুক্তি দেখিয়ে অ্যাসাইলাম চায়। তবে ইউরোপে অ্যাসাইলাম পাওয়া কঠিন, সত্যিকার ঝুঁকি ও প্রমাণ না থাকলে মেলে না।”
ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বিদেশে আশ্রয় চাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলছেন, অনিয়মিত পথে বিদেশে আসা অনেকেই রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করছেন, যার সফলতার হার খুব কম। এর ফলে প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীরা বিপদে পড়ছেন।