ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

তফসিল সামনে: নির্বাচনি মাঠ উত্তপ্ত


  • আপলোড সময় : সোমবার ০৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ সময় : ১:২২ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের নির্বাচনি মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন যদি সব কিছু ঠিক থাকে, তবে ৮ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করছে। ৩ নভেম্বর প্রথম দফায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৩৭ আসনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে। এর আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছিল। এরপরই নির্বাচনি অস্থিরতা শুরু হয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটতে থাকে।

রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলায় মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা সাধারণ মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছে। তবে নির্বাচনি বাস্তবতাকে মেনে পুলিশ সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে দলের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছেন মনোনয়নবঞ্চিত সম্ভাব্য প্রার্থী এবং তাদের অনুসারীরা। এতে দলের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষও ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে।

বিএনপির প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মনোনয়নবঞ্চিত নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তার অনুসারীরা ভাটিয়ারী শহীদ মিনার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। অন্যদিকে, ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে মনোনয়নবঞ্চিত নেতার সমর্থকরা টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করেন। পরদিন ৪ নভেম্বর দেশের আরও কয়েকটি স্থানে মনোনীত ও মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। মেহেরপুরের গাংনীতে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ হয়।

৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ জনসংযোগে বের হলে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তার অনুসারী সরোয়ার হোসেন বাবলা নিহত হন। প্রার্থী নিজেও পেটে গুলিবিদ্ধ হন এবং গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত বাবলার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ৭ নভেম্বর ফরিদপুরে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।

২৭ নভেম্বর পাবনার ঈশ্বরদীতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে এক যুবককে অস্ত্র হাতে গুলি ছোড়ার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। বিএনপি দাবি করে, অস্ত্রধারী যুবক জামায়াতের কর্মী; অন্যদিকে জামায়াত নেতারা দাবি করেন, সে বিএনপির কর্মী। এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএস) তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ৯৬টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১২ জন নিহত এবং ৮৭৪ জন আহত হয়েছেন। মনোনয়ন কেন্দ্রিক সম্ভাব্য প্রার্থী ও মনোনয়নবঞ্চিতদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৮৭৪ জন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল সংশ্লিষ্ট ৪২টি ঘটনায় অন্তত ৫১২ জন আহত এবং ১০ জন নিহত হয়েছেন।

এইচআরএস আরও জানিয়েছে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ৯টি সংঘর্ষে ৫২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৬টি সংঘর্ষে ৪১ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১৫টি ঘটনায় ১৫৫ জন আহত হয়েছেন। অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষের ২৪টি ঘটনায় ১১৪ জন আহত এবং ২ জন নিহত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক মাঠে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত হয়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দলের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হবে না। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক মাঠ আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের সময়ে ২০১৩ সালে নিবন্ধন হারানো এবং ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামী নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। দলটি খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) আরও কয়েকটি দলও প্রাথমিকভাবে প্রার্থী তালিকা তৈরি করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ৭ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ ঘোষণা করেছে।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা অনলাইনে ও অফলাইনে প্রচারণা শুরু করেছেন। মনোনয়ন বঞ্চিতদের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কর্মীদের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সারা দেশে ধারাবাহিকভাবে হামলা ও প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা নেই।’ তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ‍্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেছেন, ‘নির্বাচনের জন্য যে পরিস্থিতি প্রয়োজন, সরকার তা পুরোপুরি রাখতে পারেনি। নির্বাচনের তারিখ ও রোডম্যাপ স্পষ্ট হলে অনেক অভিযোগ হতো না। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিদ্বেষ পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, আওয়ামী লীগ নেই, জাতীয় পার্টি নেই, বিএনপির শীর্ষ নেতা বাইরে বা হাসপাতালে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল।’

তফসিল ঘোষণার পর পুলিশের সর্বাত্মক প্রস্তুতি

নির্বাচনি সংঘাত ও সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশ সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সহিংসতা কমবে নাকি বাড়বে, তা এখন দেখার বিষয়। আইজিপি বাহারুল আলম বলেছেন, ‘পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছি। তফসিল ঘোষণার পর সংঘাত সামান্য বাড়তে পারে। মৃত্যুহীন নির্বাচন এ পর্যন্ত হয়নি। বড় দুটি দল একসাথে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতো।’ ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, ‘সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। এখন পর্যন্ত কোনও সমস্যা নেই।’

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর