ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

সারা দেশে ভাস্কর্য ভাঙচুর, সংস্কারের উদ্যোগ নেই


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ সময় : ১১:০২ এএম

সাভার যাওয়ার পথে হেমায়েতপুর বাজার পার হওয়ার সময় চোখে পড়ে দুমড়ে-মুচড়ে থাকা একটি ভাস্কর্য। এটি এসানুল আহসার খান মিঠুর তৈরি “বিজয় যাত্রা” নামের ভাস্কর্য, যেখানে একসময় দু’জন মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভাঙচুর করা হলেও এখনও ভেঙে পড়া মূর্তিগুলো সরানো হয়নি। প্রতিদিন সামনের পথ ধরে যাওয়ার সময় ভাস্কর্যের অবস্থার দিকে তাকালে মনে হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের এই প্রতিকৃতিকে অসম্মান করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে সরকার পতিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। এদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারের সদস্য, জাতীয় চার নেতাসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভাস্কর্য ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকের ভাস্কর্যও ছিল। এসব ভাঙচুর দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান নাসিমুল খবির জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর তারা দেশব্যাপী ভাঙচুর করা ভাস্কর্যের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করেছিলেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে অসংখ্য ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা প্রায় সাড়ে চারশো ভাস্কর্যের তালিকা তৈরি করেছি। এদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে রাজনৈতিক কোনও সম্পর্ক ছিল না।”

নাসিমুল খবির আরও বলেন, ময়মনসিংহের মহারাজা শশীকান্ত আচার্যের বাড়ির ভেনাস ভাস্কর্য বহু আগে থেকে একদল ধর্মীয় উগ্রবাদী ভেঙে ফেলতে চেয়েছিল। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে সাবেক শিক্ষার্থী শিল্পী শামীম সিকদারের অর্ধশতাধিক মনীষীর প্রতিকৃতিও ভাঙচুর করা হয়েছে। শিশু একাডেমির সামনে সুলতানুল ইসলাম নির্মিত ভাস্কর্য, দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় শিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের তেভাগা চত্বর ভাঙা হয়েছে, যা ধর্মান্ধদের দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কোনো ভাস্কর্য সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ দেখা যায়নি। সংস্কারের বিষয়ে মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, মেহেরপুরের মুজিবনগরে তিন শতাধিক মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য ভাস্কর্য ভাঙচুর হয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত অসংখ্য ভাস্কর্য ও রিলিফ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জগন্নাথ হলে শিল্পী শ্যামল সরকারের বঙ্গবন্ধু আবক্ষ প্রতিকৃতি, শফিপুরে আনসার একাডেমিতে বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য, চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, শিবচরে মুক্তিযুদ্ধ স্মারক ভাস্কর্য, রাজশাহীতে মুক্তিযুদ্ধ স্মারক ভাস্কর্য এবং বরিশালের উজিরপুর পৌরসভায় শিল্পী শ্যামল সরকার নির্মিত বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে।

পিলখানার বিজিবি সদর দফতরে শিল্পী আশিকুর রহমানের বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য, সোনারগাঁওয়ের লোকশিল্প জাদুঘরে শিল্পী শ্যামল চৌধুরীর বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য, চট্টগ্রামের হালিশহরে বড়পুলে শিল্পী আতিকুল ইসলাম, জয়শীষ আচার্য, তপন ঘোষ, বিলাস মন্ডল, পারভেজ ও নুরের বজ্রকণ্ঠ/বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য, কুষ্টিয়ার পৌরসভার পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য উল্লেখযোগ্য।

কেরানীগঞ্জের বাবু বাজারে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, ঘাটারচরে শিল্পী সনদ কুমার বিশ্বাস ও রূপম রায় নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য, কেরানীগঞ্জের কদমতলী মোড়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজধানীর বিজয় স্মরণিতে শিল্পী শ্যামল সরকারের মৃত্যুঞ্জয় ভাস্কর্য, ময়মনসিংহ সংগ্রহশালায় শিল্পী জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ প্রতিকৃতি, নরসিংদীতে শিল্পী অলি মাহমুদ, অলোক সরকার, তপন ঘোষ, ইমরান মাহামুদ নির্মিত তর্জনী ও মৃণাল হকের রিক্সা ভাস্কর্যও ভাঙা হয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিল্পী অলোক রায় নির্মিত স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক রিলিফ ভাস্কর্য এবং শিল্পী রূপম রায় ও সৈয়দ তারেক রহমান নির্মিত ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর আত্মসমর্পণের প্রামাণ্য ভাস্কর্যও ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়াও মোহাম্মদ ইউনুস, শিশির ভট্টাচার্য, শ্যামল চৌধুরী প্রমুখের স্বাধীনতার ইতিহাসভিত্তিক টেরাকোটা রিলিফ ও ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রামাণ্য ভাস্কর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজির হোসেন বলেন, “ফুলার রোডে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ২৫ মার্চের কালরাত্রি, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণাসহ ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত নিহত শহীদের মুখাবয়ব দিয়ে ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়েছিল। এসব ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে এবং এখনও সংস্কারের উদ্যোগ নেই।”

তিনি আরও বলেন, এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন ফকির, জগদীশ চন্দ্র বসু, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সুকান্ত ভট্টাচার্য, এসএম সুলতান, সুভাষ বোস, মহাত্মা গান্ধী, কামাল আতাতুর্ক, রাজা রামমোহন রায়, মাও সেতুং, ইয়াসির আরাফাত, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, কর্নেল এমএজি ওসমানী, তাজউদ্দীন আহমদ, সিরাজ সিকদারসহ অসংখ্য গুণিজনের ভাস্কর্য ছিল, যেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের সচিবের উপসচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ভাস্কর্য সম্পর্কিত বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নেই। এটি স্থানীয় সরকার বা স্থাপত্য অধিদফতরের আওতাধীন। জাতীয় জাদুঘরের ক্ষেত্রে কিছু কাজ তারা করে থাকে। তবে ভাস্কর্য সংস্কার সংক্রান্ত উদ্যোগের কোনো তথ্য জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেন, "অভ্যুত্থান কালে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা সংস্কার করা হবে।" দেশব্যাপী ভাঙচুর করা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কিত ভাস্কর্য সংস্কারের কাজ অব্যাহত থাকবে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর