রাজধানীসহ সারা দেশে অবৈধ অস্ত্রের দৌরাত্ম্য উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আধুনিক বিদেশি অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলে বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি, হত্যা ও সহিংস কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা আরও গভীর হয়েছে।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) পাবনার ঈশ্বরদীতে গুলিতে বিএনপির এক নেতা নিহত হন। এর আগে রাজধানীতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় গুলি করা হয়। চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে সন্ত্রাসীরা একাধিক রাউন্ড গুলি চালায়। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রভাব রাজনৈতিক অঙ্গনেও পড়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে বিএনপি মনোনীত এক প্রার্থী নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অস্ত্র প্রবেশ করায় সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, তবুও অস্ত্র উদ্ধারের হার আশানুরূপ নয় বলে মত অনেকের।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানিয়েছেন, সারা দেশে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র্যাবের সব ইউনিট কাজ করছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা আব্দুস শহিদ বলেন, সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র থাকার বিষয়টি এখন স্পষ্ট। নির্বাচনের সময় এসব অস্ত্র ব্যবহার করে তারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, তবে এটিকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়। এর আগের দিন পুরোনো ঢাকার শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আবদুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। খুলনায় আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে দুজনকে হত্যা করা হয়। মিরপুরে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে এবং বুধবার পাবনায় বিএনপি নেতা বিরু মোল্লাকে (৬৫) গুলি করে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে সারা দেশে ২৭৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। একই সময়ে ডাকাতি ও দস্যুতার ১৮৪টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ১ হাজার ৭৪৪টি, অপহরণের ৯৩টি এবং চুরি ও ছিনতাইয়ের ১ হাজার ১১০টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৬৫টি।
গত ১৫ মাসে দেশব্যাপী কমপক্ষে ৪ হাজার ৮০৯টি খুনের মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসেই খুনের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ২৩৬টি। অনেক মামলা পুরোনো ঘটনার হলেও সম্প্রতি নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ৫ আগস্টের পর লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট: ফেজ-২’ চলমান রয়েছে। মঙ্গলবার সারা দেশে এ অভিযানে ১ হাজার ৯২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটের সময় ঘনিয়ে আসার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির মুখপাত্র মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, প্রতিটি থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দা ইউনিট অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতারে কাজ করছে। চেকপোস্টে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সার্বিকভাবে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। কোনো প্রার্থী নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে তা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আকাশজমিন / আরআর