দেশজুড়ে তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, দেশের চারটি বিভাগ ও ১২ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। পৌষ মাসের শেষদিকে জেঁকে বসা শীত Wednesday (৭ জানুয়ারি) নওগাঁর বদলগাছিতে মৌসুমের সর্বনিম্ন ৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। সারা দেশে কুয়াশার দাপটও থাকবে।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লা জেলা এবং রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে শৈত্যপ্রবাহ মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের, যা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। তীব্র শীত অনুভূতি আরও দুদিন থাকতে পারে। এরপর তাপমাত্রা কিছুটা বৃদ্ধি পাবে, ফলে শীতের অনুভূতি কমতে পারে।
দেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে বুধবার সূর্যের দেখা মিললেও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে কুয়াশা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারও কুয়াশার প্রবণতা থাকবে। শনিবার থেকে কুয়াশা কিছুটা কাটতে পারে। তবে জানুয়ারির পুরো মাস জুড়েই শীতের প্রকোপ বজায় থাকবে।
তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ। যাদের বেশির ভাগকেই খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয়। যশোর শহরের শ্রমবাজারে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ মানুষ কাজের আশায় জড়ো হন। তবে শীতের কারণে কাজ কম, ফলে লোকজন অর্ধেকেরও কম সময়ের জন্য উপস্থিত থাকে। অনেকেই সকাল থেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
রিকশাচালক ও শ্রমিকরা জানান, শীতের কারণে লোকজন ঘর থেকে কম বের হচ্ছে। নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ তেমন হাতে নেওয়া হচ্ছে না। এতে তাদের আয় কমে গেছে। কিন্তু সংসারের ব্যয় তো কমছে না। একই চিত্র দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও দেখা যাচ্ছে।
রংপুর মেডিক্যালে ঠান্ডাজনিত রোগে গত ২০ দিনে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ৯ ও বয়স্ক নারী-পুরুষ সাতজন। চিকিৎসকরা জানান, শীতের সঙ্গে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া সহ শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে বেশির ভাগই শিশু ও বৃদ্ধ।
হাসপাতালের শিশু বিভাগ সূত্র জানায়, তিনটি ওয়ার্ডে ১২০ শয্যা থাকলেও বুধবার পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ২৫৭ জন। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি ৩৪ জন। হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দাতেও রোগীর চিকিৎসা চলছে।
রংপুরের হারাগাছ পৌরসভার কেয়া মনির (২০) দুই মাস বয়সী মেয়ে মুনতাহাও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। মা নুরী বেগম জানান, ‘সূর্য দেখা যায় না। রাতে ঝড়ির মতো টিনের চাল দিয়ে শীত পড়ে। আমরা গরিব মানুষ, ল্যাপ বা তোশক নেই। বাচ্চা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলছেন, শীতে সব সময় ঠান্ডাজনিত রোগ বাড়ে। শীতকালে ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বেশি দেখা দেয়। এছাড়া শীতের সময় রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া দেখা দেয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিন আগে ডায়রিয়ার প্রকোপ কমেছে।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান জানান, শীতজনিত রোগের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, স্ট্রোক ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বেশি। শয্যার সংখ্যা কম থাকলেও ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬০০ থেকে ৭০০ পর্যন্ত। মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি নয়।
যশোরে শৈত্যপ্রবাহ বেড়েছে। তিন দিন পর বুধবার সূর্যের দেখা মিলেছে। রোদের উত্তাপে হাড়ের কাঁপন কিছুটা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। শ্রমজীবী ও ছিন্নমূল মানুষ তীব্র শীতে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। বুধবার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সোমবার ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫.৮ থেকে ১৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। গত ১২ দিনে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে অবস্থান করেছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৮.১–১০ ডিগ্রি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬.১–৮ ডিগ্রি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ, ৪.১–৬ ডিগ্রি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, ৪ ডিগ্রি বা তার নিচে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়।
শহরের রিকশাচালক রবিউল হোসেন ও আলী হোসেন জানান, কুয়াশা ও শীতের কারণে সকাল ও রাতের সময়ে রিকশা চালানো যায় না। দিনের বেলায় সূর্যের আলো ও হালকা রোদের কারণে কিছু আয় হয়। গৃহবধূ ইয়াসমিন আক্তার জানিয়েছেন, সন্ধ্যা ও রাতে রাস্তায় রিকশা পাওয়া যায় না, মানুষের চলাচলও কম।
সাতক্ষীরায় শীতের তাপমাত্রা নেমেছে ৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে। শীতার্তদের সহায়তায় জেলা প্রশাসন ও বেসরকারি সংগঠন শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু করেছে। জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কম্বল বিতরণ ও কার্যক্রম তদারকি করছেন।
হিলিতে শীত ও ঘন কুয়াশায় বোরো বীজ গাজাচ্ছে না বা পচে নষ্ট হচ্ছে। কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী ছত্রাকনাশক স্প্রে, পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা ও রশিটানা ব্যবহার করে বীজরক্ষা করা হচ্ছে।
নীলফামারীতে শীতজনিত রোগে শিশুরা আক্রান্ত। ডিমলা আবহাওয়া অফিস জানায়, শীত আরও কয়েক দিন থাকবে। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আব্দুল আউয়াল সতর্ক করেছেন, শিশু ও নবজাতককে গরম কাপড় ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে হবে।