ক্রীড়া ডেস্ক
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের একটি মৌসুম কতটা প্রতিযোগিতামূলক, তা সবসময়ই ক্রিকেট বিশ্লেষকদের জন্য একটি জটিল প্রশ্ন। কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা বোঝেন দলগুলোর মধ্যে শক্তির ভারসাম্য হিসেবে, যেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং পয়েন্ট টেবিল শেষ পর্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ থাকে। অন্যরা বলেন, এটি নির্ভর করে খেলোয়াড়দের দক্ষতা, কৌশলগত পরিপক্কতা এবং আন্তর্জাতিক সেরা খেলোয়াড়দের উপস্থিতির ওপর। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে, যেখানে মাত্র কয়েক ওভারে ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারে, সেখানে প্রতিযোগিতার সার্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন।
ক্রিকেট বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান উইজডেন এই প্রশ্নটি পরিমাপযোগ্য কোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছে। তারা দলের ভারসাম্য বা তারকা খেলোয়াড়ের উপস্থিতি নয়, বরং ব্যাট ও বলের লড়াইয়ের ভারসাম্যকে প্রতিযোগিতার মূল মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি আদর্শ প্রতিযোগিতামূলক লিগ হলো যেখানে কোনো একটি বিভাগ (ব্যাট বা বল) এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে না। ব্যাটার ও বোলার উভয়কেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, এবং একতরফা ম্যাচ খুব কম ঘটে।
বিশ্লেষণে দশটি লিগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লিগগুলো হলো: আইপিএল (ভারত), দ্য হান্ড্রেড (ইংল্যান্ড), সিপিএল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), এলপিএল (শ্রীলঙ্কা), বিবিএল (অস্ট্রেলিয়া), আইএলটি-টোয়েন্টি (সংযুক্ত আরব আমিরাত), এসএ-টোয়েন্টি (দক্ষিণ আফ্রিকা), বিপিএল (বাংলাদেশ), পিএসএল (পাকিস্তান) এবং এমএলসি (যুক্তরাষ্ট্র)। আধুনিক ক্রিকেটের ট্রেন্ড ধরে রাখতে ২০২২-২৩ বিগ ব্যাশ লিগ থেকে শুরু হওয়া ম্যাচগুলিকেই নমুনা হিসেবে ধরা হয়েছে।
ব্যাট ও বলের ভারসাম্য পর্যালোচনা করতে ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ২০২৫ সালের আইপিএল সবচেয়ে বেশি রান হওয়া টুর্নামেন্ট হিসেবে উঠে এসেছে, যার স্ট্রাইক রেট ১৫২.৩৯। ২০২৪ সালের আইপিএলের স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫০.৫৮। তবে বেশি রান হওয়া মানেই বোলারদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি। ২০২৫ আইপিএলে বোলারদের বোলিং স্ট্রাইক রেট ছিল ১৯.৮, যা ৩২টি টুর্নামেন্টের মধ্যে পঞ্চম সর্বনিম্ন। এই তথ্য প্রমাণ করে যে সেই মৌসুমে ব্যাটারদের দাপট উল্লেখযোগ্য ছিল। আইপিএল একমাত্র লিগ যেখানে ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ নিয়ম ছিল, যা দলগুলোকে অতিরিক্ত ব্যাটার ব্যবহারের সুযোগ দেয় এবং রানরেট বাড়ায়।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে স্ট্রাইক রেট ছিল ১২০.২৮—সব চেয়ে কম। সেখানে বোলারদের বোলিং স্ট্রাইক রেট ১৮.৮, যা তাদের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক।
একটি আদর্শ লিগে কোনো একটি বিভাগ অতিমাত্রায় প্রভাবশালী হওয়া উচিত নয়। ব্যাটিং ও বোলিং—উভয় ক্ষেত্রেই ভারসাম্য থাকা জরুরি। ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট বেশি কিন্তু বোলিং স্ট্রাইক রেট কম হলে ব্যাটাররা দ্রুত রান তুললেও দ্রুত আউট হয়। উভয় রেটই কম হলে লিগটি বোলারদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট কম ও বোলিং স্ট্রাইক রেট বেশি হলে ব্যাটাররা ধীরে খেললেও ক্রিজে দীর্ঘ সময় টিকে থাকে।
প্রথম ইনিংস বনাম দ্বিতীয় ইনিংসের রান পার্থক্যও প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যেসব লিগে দিবা-রাত্রির ম্যাচ বেশি হয়, সেখানে শিশিরের কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে রান তাড়া করা সহজ হয়ে ওঠে। যদি দ্বিতীয় ইনিংসে বেশি রান হয়, বোঝা যায় সেখানে রান তাড়া সহজ। দুই ইনিংসের পার্থক্য কম থাকলে ম্যাচটি ভারসাম্যপূর্ণ।
২০২২/২৩ বিবিএল থেকে শুরু করে এই ১০টি লিগে মোট ১,১৮১টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলা হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি ম্যাচ টাই এবং ৬৩টি ম্যাচ ৫ রান বা তার কম ব্যবধানে শেষ হয়েছে। ২০২৩-২৫ সালে আইপিএলে ১৫টি ম্যাচ ৫ রান বা কম ব্যবধানে শেষ হয়েছে। ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ এমন ম্যাচ হয়েছে ১০টি। আইপিএলে ম্যাচের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শতাংশ হিসেবে রোমাঞ্চকর ম্যাচের হার কম। সামগ্রিকভাবে ‘দ্য হান্ড্রেড’ সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ, যেখানে ১০.২% ম্যাচ ৫ রান বা কম ব্যবধানে শেষ হয়েছে। এরপর পিএসএল ৮.০৮% এবং আইপিএল ৬.৯৪%।
যদি কোনো লিগে নিয়মিত ১৮০-এর বেশি রান তাড়া করে জয় হয়, বোঝা যায় প্রথম ইনিংসের বড় স্কোর নিরাপদ নয়। এটি ব্যাটিং গভীরতা ও ফ্লাডলাইটের নিচে অনুকূল পরিস্থিতির প্রমাণ। ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিযোগিতার সর্বশেষ সংস্করণে ১৮০-এর বেশি রান তাড়া করে জয়ের ঘটনা ৩৯ বার ঘটেছে, যার মধ্যে ১৫ বার আইপিএলে। বিবিএলে ৪ বার, এমএলসিতে ৮ বার এবং পিএসএলে ৫ বার।
অন্যদিকে, ১৪০ বা তার কম রান ডিফেন্ড করে জয়ের ঘটনা ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৭ বার ঘটেছে। ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ ১০.২% ম্যাচ এবং বিগ ব্যাশে ৩.৬% ম্যাচে এমন ফলাফল। পিএসএলে কোনো ম্যাচে ১৪০ বা কম রান ডিফেন্ড করে জয়ের ঘটনা নেই।
শেষমেষ, একটি টি-টোয়েন্টি লিগের প্রতিযোগিতা নির্ভর করে ব্যাট ও বলের ভারসাম্য, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং ফলাফলের অনিশ্চয়তার ওপর। যেসব লিগে উভয় বিভাগই সমান প্রভাব ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা বজায় থাকে। এই দিক থেকে ‘দ্য হান্ড্রেড’ এবং ‘সিপিএল’ আদর্শ ভারসাম্যের উদাহরণ। আইপিএল-এর মতো লিগে ব্যাটিংয়ে আধিপত্য থাকলেও কৌশলগত ভারসাম্য কিছুটা কম। তাই প্রতিযোগিতা মানে কেবল হাই স্কোর বা তারকা খেলোয়াড় নয়, বরং এমন এক পরিবেশ যেখানে প্রতিটি ম্যাচ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রাণবন্ত থাকে।
আকাশজমিন / আরআর