অনলাইন রিপোর্টার
শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো সব পাঠ্যবই পৌঁছায়নি। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে। নতুন শিক্ষাবর্ষের ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রায় ৩ কোটি পাঠ্যবই এখনো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন রোডে অবস্থিত ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি গিয়ে দেখা যায়, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির কোনো বইই তখনো আসেনি। শিক্ষাবর্ষ শুরুর ১১তম দিনে গিয়ে জানা যায়, সপ্তম শ্রেণির বাংলার দুটি বিষয়ের (প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র—সপ্তবর্ণা ও আনন্দপাঠ) বই এসেছে। অষ্টম শ্রেণিতে এসেছে পাঁচটি বিষয়ের বই। তবে বাকি বিষয়গুলোর বই এখনো বিদ্যালয়ে পৌঁছায়নি। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরের সব শ্রেণির বই এবং ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির (হিসাববিজ্ঞান বাদে) প্রায় সব বই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে পেয়েছে।
চলতি শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে পুরোনো বই ব্যবহার করে পাঠদান করানো শিক্ষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন বই ছাড়া পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পাঠদান সম্ভব না হওয়ায় সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয়ের মতো দেশের অসংখ্য বিদ্যালয়েই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণিতে তুলনামূলকভাবে বই সরবরাহ সন্তোষজনক হলেও সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির সব বিষয়ের বই এখনো সরবরাহ শেষ হয়নি। তবে প্রাথমিক স্তরের বই শতভাগ সরবরাহ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সব শিক্ষার্থী সব বিষয়ের বই হাতে পাবে। কিন্তু পাঠ্যবই ছাপানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, ওই সময়ের মধ্যে হয়তো ছাপার কাজ শেষের পথে যাবে। তবে বাঁধাই, সরবরাহপূর্ব পরিদর্শন (পিডিআই) এবং পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে। এতে করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৩০ কোটি ২ লাখের বেশি। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়িসহ) মোট পাঠ্যবইয়ের পরিমাণ ২১ কোটি ৪৩ লাখ ১৪ হাজার ২৭৪ কপি। ১০ জানুয়ারি রাত আটটা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, এর মধ্যে ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ পাঠ্যবই সরবরাহ করা হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ ৯৫ হাজার কপি। এখনো সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি ২ কোটি ৯২ লাখ ১৮ হাজারের বেশি বই, যা মোটের ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত রমনা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তাঁদের অধীনে ২৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বই বিতরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির সব বই বিতরণ শেষ হয়েছে। অষ্টম শ্রেণিতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয় ছাড়া বাকি সব বই এসেছে। আর সপ্তম শ্রেণির জন্য শুধু বাংলার দুই বিষয়ের বই পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, ১ জানুয়ারি যখন শিক্ষা অফিসে বই আসতে শুরু করেছিল, তখন ছোট ট্রাকে বই নামানো হচ্ছিল। কয়েক দিন পর দেখা গেছে, বড় ট্রাক থেকেও বই নামানো হচ্ছে। অর্থাৎ এখনো বই আসার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরী জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছে দিতে তাঁরা আশাবাদী। তিনি বলেন, সরবরাহ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা চলছে।
ঢাকার বাইরে বই সংকটের চিত্রও প্রায় একই রকম। নেত্রকোনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, এই জেলায় মাধ্যমিক পর্যায়ে (ইবতেদায়ি ও কারিগরিসহ) মোট বইয়ের চাহিদা ২৬ লাখ পাঁচ হাজার কপি। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে ২১ লাখ ৯১ হাজারের বেশি বই। এখনো ঘাটতি রয়েছে ৪ লাখ ১৩ হাজারের বেশি কপি।
নেত্রকোনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবীর আহাম্মদ জানান, মাধ্যমিক পর্যায়ে বিশেষ করে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির কিছু বইয়ের ঘাটতি রয়েছে। তবে আশা করা হচ্ছে, এক সপ্তাহের মধ্যে এসব বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠে মোট শিক্ষার্থী ৩২৯ জন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান জানান, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এখনো গণিত বই পায়নি। ওই শ্রেণিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ৬৫ জন। বই না পাওয়ায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
শিক্ষাবিদদের মতে, বছরের শুরুতে পাঠ্যবই না পেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ছন্দ নষ্ট হয়। নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রস্তুত করা বইগুলো ছাড়া পাঠদান কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব নয়। ফলে দ্রুত বই সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।