অনলাইন রিপোর্টার
বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটার সরবরাহ সংক্রান্ত বিতর্কিত ব্যবসা আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে। হেক্সিং নামের চীনা কোম্পানি, যা ইতিমধ্যেই বিতর্ক ও অর্থ পাচারের অভিযোগে সাড়া ফেলেছে, বর্তমানে নতুন দরপত্রে অংশ নিচ্ছে। বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে কারণ এই কোম্পানি আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি মিটার সরবরাহ করেছিল।
বিদ্যুৎ খাতের ছয়টি বিতরণ সংস্থাকে গত ১৯ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিভাগ একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, হেক্সিং বিভিন্ন দেশে কালো তালিকাভুক্ত এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে তাদের সঙ্গে কোনো লেনদেন বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনে সতর্ক থাকতে হবে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এই সতর্কতার পরও হেক্সিং একাধিক দরপত্রে অংশ নিচ্ছে।
২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর প্রথম আলো ‘মিটার–বাণিজ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ভাই-বন্ধু চক্র’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মার্চে একটি কমিটি গঠন করে তদন্তে হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যাচাই করে। কমিটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, হেক্সিং দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছে। এই অভিযোগের কারণে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোকে সতর্ক থাকার সুপারিশ করা হয়েছিল।
সম্প্রতি ওজোপাডিকো খুলনা, বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলের জন্য ১ লাখ ৩৮ হাজার মিটারের দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে ছয়টি কোম্পানি অংশ নিয়েছে, যার মধ্যে হেক্সিংও আছে। দ্বিতীয় দফায় ৫১ হাজার মিটারের দরপত্র মূল্যায়ন চলছে, তাতেও হেক্সিং অংশগ্রহণ করছে। হেক্সিংয়ের অংশগ্রহণকে আইনগতভাবে বাধা দেওয়া যায়নি কারণ বিদ্যুৎ বিভাগ তাদের কালোতালিকাভুক্ত করেনি।
হেক্সিংয়ের চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, তারা ভারত, নেপাল ও কেনিয়ায় কালোতালিকাভুক্ত নয় এবং ভূরাজনৈতিক কারণে ভারত তাদের বাধাগ্রস্ত করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ওজোপাডিকোতে দায়ের করা মামলাগুলোও প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ জাকিরুজ্জামান জানান, আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণে বাধা নেই, তবে দরপত্র মূল্যায়নে বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ খাতে মিটার–বাণিজ্যের ইতিহাস বলছে, হেক্সিংয়ের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন নসরুল হামিদের বন্ধু, রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন ওরফে কাজল। আরেকটি কোম্পানি সেনজেন স্টারের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন নসরুল হামিদের স্ত্রীর বড় ভাই প্রয়াত মোহাম্মদ সুজাত ইসলাম। কোভিড মহামারির পর এ দায়িত্ব নেন তার নিকট আত্মীয় মাহবুব রহমান তরুণ।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, পিডিবির একটি দরপত্রে অন্য কোম্পানি সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল হেক্সিং। দরপত্র বাতিল করে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পিএস সরাসরি মিটার কেনার নির্দেশ দেন। এর ফলে দরপত্র ছাড়াই হেক্সিং সরাসরি ব্যবসায় প্রবেশ করে। ২০২১ সালে বেসিকোর মিটার সরবরাহ কার্যক্রমের নিরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, তারা নিজেরা উৎপাদিত মিটার না দিয়ে আমদানি করে ৩৬ কোটি টাকা বেশি দেখিয়ে অর্থ পাচার করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি জানায়, হেক্সিং দরপত্রের দলিল প্রস্তুতিতে হস্তক্ষেপ, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো এবং আর্থিক কেলেঙ্কারি করেছে। পরে ওজোপাডিকো সব মামলা তুলে নেয়, দুদকের অভিযোগ প্রত্যাহার প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত হেক্সিং আইনি প্রক্রিয়ায় অব্যাহতি পায়নি, ততক্ষণ তাদের ব্যবসায় অংশ নেওয়া জনস্বার্থবিরোধী। এম শামসুল আলম, ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের সতর্কতামূলক চিঠি যথেষ্ট নয়; আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কালোতালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান উল্লেখ করেন, তদন্তে সব বিস্তারিত উঠে এসেছে এবং নির্দেশনা অমান্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে হেক্সিং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে এবং নতুন চক্র গঠন করতে তৎপর। এটি দেশের বিদ্যুৎ খাতের স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
আকাশজমিন / আরআর