ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

নীলফামারীতে হাজার শয্যাবিশিষ্ট মৈত্রী হাসপাতাল অনুমোদিত


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৩:৫৭ পিএম

উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর সভায় গত রোববার এই প্রকল্পকে অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে প্রকল্পটি জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ সময়কালে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২,৪৫৯.৩৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ১৭৯.২৭ কোটি টাকা এবং বাকি অংশ চীনা অনুদান সহায়তা।

গত বছরের মার্চে চীন সফরকালে বাংলাদেশের জন্য উন্নত হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টা চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করে চীন সরকার।

প্রকল্পের আওতায় নীলফামারী সদর উপজেলায় একটি আধুনিক ১০ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডরমেটরি ও আবাসিক ভবন, ডিরেক্টরস বাংলা, প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো এবং আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।

এই হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি, নিউরোলজি প্রভৃতি বিশেষায়িত বিভাগ চালু করা হবে। এছাড়া আধুনিক জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউ, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা দেওয়া হবে।

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস একনেক সভায় বলেন, “এই হাসপাতাল শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষ নিজ এলাকায় উন্নত চিকিৎসা সেবা পাবেন। রংপুর ও ঢাকা-কেন্দ্রিক হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। নীলফামারীর এই হাসপাতাল সেই লক্ষ্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।”

তিনি আরও বলেন, “এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু বাংলাদেশের রোগীরাই নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। নেপাল ও ভূটানসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর রোগীরাও এখানে উন্নত চিকিৎসা সেবা পাবেন। এতে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে।”

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজস্ব খাতে প্রায় ৮৯৩ জন চিকিৎসক, ১,১৯৭ জন নার্স এবং ১,৪১০ জন অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় ও দীর্ঘ ভ্রমণজনিত ভোগান্তি কমবে, সময়মতো জীবনরক্ষাকারী সেবা নিশ্চিত হবে এবং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

প্রকল্পের আওতায় একটি ১০ তলা নতুন হাসপাতাল ভবন, ১০ তলা অধ্যাপক ও সিনিয়র ডক্টর কোয়ার্টার ভবন, ১০ তলা ডক্টরস ডরমেটরি ভবন, দুই তলা বিশিষ্ট ডুপ্লেক্স ডিরেক্টরস বাংলো, দুইটি ৬ তলা নার্স ডরমেটরি ভবন এবং দুটি ১০ তলা কর্মচারী কোয়ার্টার নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে।

নীলফামারী জেলায় প্রায় ২১ লক্ষ মানুষ বসবাস করছেন, যার বড় অংশ গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মানদণ্ড অনুযায়ী এই জনসংখ্যার জন্য আনুমানিক ৪,৫০০–৬,০০০ শয্যা প্রয়োজন, অথচ বর্তমানে জেলা পর্যায়ে কার্যকর শয্যা সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

বিদ্যমান স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে শয্যা, বিশেষায়িত বিভাগ ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা সীমিত থাকায় গুরুতর রোগীদের রংপুর বা ঢাকায় যেতে হয়। এতে সময়, ব্যয় ও ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, মাতৃ ও নবজাতক জটিলতা এবং সংক্রামক রোগের বোঝা। এই রোগের চিকিৎসায় উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সার্জারি ও ইনটেনসিভ কেয়ার অপরিহার্য।

জেলায় বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা মূলত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল এবং উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানে আইসিইউ, এইচডিইউ, ডায়ালাইসিস, পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার ইউনিট, নিউরো ইমার্জেন্সি, কার্ডিয়াক কেয়ার, বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি এবং বিশেষায়িত মাতৃ ও নবজাতক সেবা সীমিত। ফলে গুরুতর ও জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের রেফার করতে হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এই হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য একটি নতুন চিকিৎসা সম্ভাবনা খুলে দিচ্ছে। তারা দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম না করে স্থানীয়ভাবে উন্নত সেবা পাবেন। এটি শুধু স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি করবে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও বড় প্রভাব ফেলবে।”

প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে নীলফামারী ও পার্শ্ববর্তী জেলার মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে, জরুরি রোগে জীবন রক্ষা সহজ হবে, আর দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর