অনলাইন রিপোর্টার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাতেও ততই বাড়ছে অস্বাভাবিক তৎপরতা। বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ টাকার প্রবাহ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নতুন করে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নির্বাচনি প্রচার, কর্মী ব্যবস্থাপনা, সভা-সমাবেশ এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে প্রার্থীদের একটি বড় অংশ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের পথ বেছে নিচ্ছেন। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মাসে—ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে—ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। নভেম্বরে যেখানে এই অঙ্ক ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা, সেখানে জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসেই নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সাম্প্রতিক সময়ে নগদ টাকা উত্তোলনের পরিমাণ বেড়েছে। প্রার্থীরা প্রচার ব্যয় মেটাতে নগদ অর্থ ব্যবহার করছেন বলেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।” তিনি আরও জানান, বড় বা সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে এবং ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত এসব লেনদেন রিপোর্ট করার নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।
নগদ টাকার এই ঊর্ধ্বগতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এর আগের কয়েক মাসে চিত্র ছিল পুরোপুরি উল্টো। গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়জুড়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থ ধারাবাহিকভাবে কমছিল। জুলাইয়ে যেখানে এই অঙ্ক ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা, আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকায়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে এই পতন অব্যাহত থেকে নভেম্বরে নেমে আসে প্রায় ২ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকায়। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করে এই প্রবণতা উল্টো দিকে মোড় নেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই হঠাৎ উল্টো স্রোতের সঙ্গে নির্বাচনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “নির্বাচনি ব্যয়ের বড় অংশই নগদে হয়। তাই ভোটের আগে মানুষের হাতে নগদ টাকা বাড়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক লেনদেন হলে তা বিএফআইইউকে রিপোর্ট করার ব্যবস্থাও কার্যকর রয়েছে।”
নগদ টাকার এই দ্রুত বিস্তার নতুন করে কালোটাকার ব্যবহার নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় অর্থের অপব্যবহার এবং অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকি বাড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই আশঙ্কার প্রেক্ষাপটেই নির্বাচনের আগে নজরদারি আরও জোরদার করেছে বিএফআইইউ।
গত ১১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো হিসাবে এক দিনে এক বা একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ অর্থ জমা বা উত্তোলন হলে তা বাধ্যতামূলকভাবে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) আকারে বিএফআইইউকে জানাতে হবে। অনলাইন, এটিএমসহ সব ধরনের নগদ লেনদেনই এর আওতায় পড়বে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এসব প্রতিবেদন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থ হলে বা ভুল তথ্য দিলে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
নগদ টাকার প্রবাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি নির্বাচনকে সামনে রেখে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকে দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক চিত্র—রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। শুধু জানুয়ারিতেই এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি। এর আগের মাস ডিসেম্বরেও রেমিট্যান্স ছিল রেকর্ড ছোঁয়া—৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত রমজান বা ঈদকেন্দ্রিক সময়ে রেমিট্যান্স বাড়ে। তবে এবার মৌসুমি কারণের বাইরে গিয়ে নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসীদের একটি অংশ অতিরিক্ত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন—এমন ইঙ্গিত মিলছে।
রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহও বেড়েছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নিলামের মাধ্যমে ১৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে এই ডলার কেনা হয়। এর বিপরীতে ওই দিনই বাজারে ছাড়া হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯১ কোটি টাকা, যা টাকার বাজারে তারল্য বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে এ পর্যন্ত মোট ৩৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার কেনা হয়েছে। এর বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে আনুমানিক ৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। আর চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩২ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। গড় বিনিময় হার অনুযায়ী, এর বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহ তুলনামূলক ভালো রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জোরদার করা হচ্ছে, অন্যদিকে টাকার বাজারে প্রয়োজনীয় তারল্য সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, অতিরিক্ত তারল্য মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে রিজার্ভ বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচনের আগে অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে ডিজিটাল লেনদেনেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে আগামী ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিকাশ, নগদ ও রকেটসহ সব মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় একজন গ্রাহক দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারবেন। প্রতিটি লেনদেনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা। একইসঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে অর্থ স্থানান্তর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনি মাঠে পোস্টার ও মিছিলের বাইরেও একটি বড় অদৃশ্য অর্থনীতি সক্রিয় থাকে, যার বড় অংশই নগদ লেনদেননির্ভর। যদিও নির্বাচন কমিশন ভোটারপ্রতি ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, বাস্তবে সেই সীমা কার্যকর হচ্ছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজনীতিকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেই কালোটাকার জন্ম, আর সেখান থেকেই দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ে—যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আকাশজমিন / আরআর