অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্ষমতা ও সময়সীমা শেষের পথে বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা ও সম্ভাবনা এখন শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষায়, “যেটুকু সংস্কার করার সুযোগ ছিল, যেটুকু সংস্কার করার জায়গা ছিল, যেটুকু বিচার করার জায়গা ছিল—ওনাদের দম ফুরিয়ে গেছে।”
আজ রোববার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন: রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এসব কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেসব লক্ষ্য সামনে রেখে দায়িত্ব নিয়েছিল, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অগ্রগতি এখন সীমিত। তিনি বলেন, সরকারের সক্ষমতা ও সম্ভাবনা বর্তমানে শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। এ অবস্থায় সরকারের সামনে কার্যকরভাবে যে কাজটি করার সুযোগ রয়েছে, তা হলো একটি ভালো, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা।
অনুষ্ঠানে সিজিএস পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়, যেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নির্বাচনী অংশগ্রহণে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরা হয়। দেশের ৫০৫ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ২৫ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা নিজেকে অনিরাপদ বা চরম অনিরাপদ মনে করেন।
জরিপের ফলাফল পরবর্তী আলোচনায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের বক্তব্য ও বাস্তব কাজের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক ছাতার নিচে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে সেই ছাতা খোলাই হয়নি। তার ভাষায়, “ছাতা তো খুললই না, বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে।”
তিনি মনে করেন, আসন্ন নির্বাচন এখনো যথেষ্ট অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠতে পারেনি। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতছাড়া হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সুযোগ এখনো রয়েছে এবং সেই সুযোগ কাজে লাগানো সরকারের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী কিংবা ভিন্নমতের রাজনৈতিক শক্তি—সবার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে অংশগ্রহণ, আর সেই অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ভোটের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভোটের আগে ও পরে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্তর্বর্তী সরকারের বড় দায়িত্ব। নির্বাচনকালীন সহিংসতা, ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এটি শেষ বড় সুযোগ। এই সরকার যদি একটি ভালো নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, তবে ইতিহাসের পাতায় তাদের জন্য কিছুটা হলেও ইতিবাচক জায়গা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, “এই সরকার যদি সর্বশেষ ভালো কাজটি করে যেতে পারে, তাহলে ইতিহাসের পাতায় তাদের কিছুটা জায়গা পাওয়ার সুযোগ হলেও হতে পারে।”
অনুষ্ঠানে আরও অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ও অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান। তারা নির্বাচনে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন এবং জবাবদিহিতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
অনুষ্ঠানে আলোচকরা মনে করেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়। তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব কেবল নির্বাচন আয়োজন নয়, বরং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করাও জরুরি।
আকাশজমিন / আরআর