নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন, এতে ভোটারের জন্য বিশেষত বৃদ্ধ, নারী, অসুস্থ এবং দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা ভোটারদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হবে। অন্যদিকে, কিছু অংশ বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা অনিয়মের চিত্র প্রচারে সহায়তা করবে এবং এটি ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে নির্বাচন কমিশন এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর মাধ্যমে বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা, নির্বাচনী সুরক্ষা অ্যাপ ব্যবহারকারী এবং দুই জন আনসার সদস্য ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না।
ভোটারদের উদ্বেগ
নিষেধাজ্ঞার সমালোচকরা বলছেন, যারা গ্রাম বা দূরবর্তী এলাকা থেকে ভোট দিতে আসবেন, তাদের জন্য মোবাইল ফোন ছাড়া ভোটকেন্দ্রে থাকা অনেক কঠিন হবে। বিশেষ করে, যাত্রাপথে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বা কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ফোনের প্রয়োজন হয়। নারীরা, বয়স্ক এবং অসুস্থ ভোটাররা মোবাইল ফোন ছাড়া ভোটকেন্দ্রে বসে থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এমন মন্তব্যও এসেছে।
একজন সাধারণ ভোটার শামসুন্নাহার রুমি তার ফেসবুকে লিখেছেন, এই যুগে মোবাইল ফোন ছাড়া ভোটকেন্দ্রে যাওয়া অসম্ভব। ভোট দিতে যাওয়ার আগেই মানুষের ফোন রাখতে বলা হচ্ছে, যা ভোটারদের জন্য বড় সমস্যা। তিনি আরও বলেন, এটা কি কোনো স্কুল পরীক্ষা, যেখানে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা হবে? মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে দিন।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহও তার মতামত জানিয়েছেন, এটা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। মোবাইল ফোন ছাড়া ভোটকেন্দ্রে থাকা বিপদজনক হতে পারে। যদি কোনো কিছু ঘটে, মোবাইল ছাড়া যোগাযোগ সম্ভব নয়।
ইসির যুক্তি
নির্বাচন কমিশন বলছে, এটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তবে ভোটারদের একটি অংশ মনে করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের দায় ভোটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তারা বলছেন, ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, তবে ভোটারদের বাস্তব সমস্যা মেনে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন ছিল।
ইসি জানিয়েছে, যদি কেউ ভুল করে মোবাইল নিয়ে আসেন, তাহলে তারা তা প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে জমা দিয়ে ভোট দিতে পারবেন। তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, হাজার হাজার ভোটারের মোবাইল ফোন জমা রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব?
সাংবাদিকদের জন্যও শঙ্কা
এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সাংবাদিকরা কীভাবে ভূমিকা রাখবেন, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। একাধিক সাংবাদিক তাদের রিপোর্টিং কার্যক্রমের জন্য মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে অনিয়মের চিত্র প্রকাশে। যদি সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তবে তারা ভোটকেন্দ্রের বাইরে কিছু ঘটলে তা রিপোর্ট করতে পারবে না, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মতো হবে বলে অনেকে মনে করছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, “চিঠির ভাষা দেখে মনে হচ্ছে, সাংবাদিকরাও মোবাইল ফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে আমরা সেকশন থেকে যোগাযোগ করে বিষয়টি স্পষ্ট করবো। যদি সাংবাদিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য না হয়, তবে আমরা এই বিষয়ে ক্লিয়ারিফিকেশন দেব।
পরবর্তী পদক্ষেপ
সব মিলিয়ে, ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং ভোট প্রক্রিয়া সুষ্ঠু করার জন্য নেওয়া এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা চলছে। ভোটারদের উদ্বেগ এবং সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে এখনও আলোচনার শেষ হয়নি। নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে এবং ভোটারদের বাস্তব সমস্যা মোকাবেলা করতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আকাশজমিন / আরআর