বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আমন্ত্রণ পেয়েও ভারত, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়াসহ মোট আটটি দেশ এবং একটি আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক সংস্থা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ইসির পক্ষ থেকে ভারত, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, মিসর, কুয়েত, মরক্কো ও রোমানিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ফোরাম অব দ্য ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বডিস অব সাউথ এশিয়া (এফইএমবিওএসএ)-কেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে এসব দেশ ও সংস্থার কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়ে নিশ্চিত কোনো জবাব আসেনি।
সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, হাতে আর মাত্র দু’দিন সময় রয়েছে। এত অল্প সময়ে এসব দেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষক পাঠানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কার্যত তারা এবারের নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে অংশ নিচ্ছে না বলেই ধরে নেওয়া যায়।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৬০ জন অতিথি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে আসছেন। ইতোমধ্যে তাদের কেউ কেউ ঢাকায় পৌঁছেছেন। বাকিদের শিগগিরই ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সরকারিভাবে ৯ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার একটি হোটেলে তাদের জন্য আতিথেয়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব অতিথি পর্যবেক্ষকের থাকা, যাতায়াত ও নিরাপত্তার বিষয়টি সরকারিভাবেই তত্ত্বাবধান করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে মোট ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে আসছেন। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে আসছেন প্রায় ৬০ জন অতিথি। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে আসছেন প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক। এ ছাড়া বিশ্বের ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫০ জন বিদেশি সাংবাদিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশে উপস্থিত থাকবেন।
ইসির আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন ভুটান ও নাইজেরিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার আইসিএপিপির স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া তুরস্ক থেকে ছয়জন সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম ইলেকশন কাউন্সিলের কর্মকর্তাসহ ১০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়া থেকে পাঁচজন করে প্রতিনিধি দল এবং ফিলিপাইন, জর্জিয়া, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান ও ইরানের নির্বাচন কমিশনের কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে আগত প্রায় ৩৩০ জন পর্যবেক্ষকের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক রয়েছেন ২২৩ জন। এ ছাড়া কমনওয়েলথ থেকে ২৫ জন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (এএনএফআরইএল) থেকে ২৮ জন, ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) থেকে ১২ জন এবং অন্যান্য সংস্থা থেকে প্রায় ৩০ জন পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিচ্ছেন।
বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যেও এবারের নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রায় ১৫০ জন বিদেশি সাংবাদিক নির্বাচন কাভার করতে বাংলাদেশে আসছেন। এর মধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৮ জন সাংবাদিক রয়েছেন। এ ছাড়া আল জাজিরা থেকে সাতজন সাংবাদিকসহ জাপানের সংবাদসংস্থা এনএইচকে, বিবিসি নিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স, এবিসি অস্ট্রেলিয়া ও ডয়েচে ভেলের প্রতিনিধিরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ সংগ্রহে সক্রিয় থাকবেন। স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও এ তালিকায় রয়েছেন।
সরকারের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে। এসব দেশ থেকে আগত প্রতিনিধিরা নির্বাচনী পরিবেশ, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ও সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
এদিকে সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য রাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ড থেকে আগত মোট ২০০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) থেকে মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শুরু করবেন। নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের এই উপস্থিতিকে নির্বাচন কমিশন ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।