ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বিদায় ‘দুই নেত্রী’র যুগ, ৩৬ বছর পর নতুন অধ্যায়


  • আপলোড সময় : বুধবার ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৬:৪৯ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার  

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত—মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর বাদ দিলে—প্রায় সাড়ে তিন দশক দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই নারী নেতা: বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। দীর্ঘ এই সময়কে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রায়ই ‘দুই নেত্রীর যুগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং দুই নেত্রীর অনুপস্থিতি দেশের ক্ষমতার সমীকরণে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ছেদ টানে। গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। ফলে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটির নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পথ আপাতত বন্ধ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ পরিস্থিতি দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে।

সম্প্রতি একটি বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় জানান, তার মা আগে থেকেই রাজনীতি থেকে অবসরের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এটিই তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়াকে তিনি ‘এক অর্থে শেখ হাসিনা যুগের অবসান’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস বহনকারী সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তার পুত্র তারেক রহমান।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক ময়দানে এখন আর কোনো নারী শীর্ষ নেতৃত্ব নেই। বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। দলটি নির্বাচনে জয়ী হলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন—এমন প্রত্যাশা ও আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে। এটি হবে তারেক রহমানের জন্য প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যেখানে তিনি সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোটও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়। এই জোট থেকে সরকারপ্রধান হিসেবে যাকে বেছে নেওয়া হোক না কেন, তিনি পুরুষ নেতা হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে প্রায় ৩৬ বছর পর বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে আবারও পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন ঘটতে যাচ্ছে।

১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে ১৯৮৯-১৯৯০ সালে কাজী জাফর আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। সেই হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ৩৬ বছর পর কোনো পুরুষ নেতা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন—যা সংসদীয় ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তাজউদ্দীন আহমদ। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে দেশের নেতৃত্ব পরিবর্তিত হয়েছে।

বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন—তাজউদ্দীন আহমদ (১৯৭১-১৯৭২), শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭২-১৯৭৫), মুহাম্মদ মনসুর আলী (১৯৭৫), শাহ আজিজুর রহমান (১৯৭৯-১৯৮২), আতাউর রহমান খান (১৯৮৪-১৯৮৫), মিজানুর রহমান চৌধুরী (১৯৮৬-১৯৮৮), মওদুদ আহমদ (১৯৮৮-১৯৮৯), কাজী জাফর আহমদ (১৯৮৯-১৯৯০), বেগম খালেদা জিয়া (১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬ স্বল্প সময়, ২০০১-২০০৬) এবং শেখ হাসিনা (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০২৪)।

দুই নেত্রীর দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেমন এসেছে, তেমনি নির্বাচন নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অনেকেই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’ এবং সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘ডামি ভোটের নির্বাচন’ বলে সমালোচনা করা হয়েছে। এসব বিতর্ক দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান বলেন, গত তিন দশকে নারী নেতৃত্ব বাংলাদেশে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। তবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যু—এই দুই বাস্তবতায় ক্ষমতার কেন্দ্রে পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। তার মতে, এটি কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন নয়; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কাঠামোয়ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশ মনে করেন, ‘দুই নেত্রীর যুগ’ শেষ হওয়া মানেই রাজনৈতিক মেরুকরণের অবসান নয়। বরং নতুন নেতৃত্বের অধীনে রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে দুই প্রধান দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি একটি যুগের অবসান এবং সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর দেশের রাজনীতিতে পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি অনন্য মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে এবং নতুন নেতৃত্ব দেশকে কোন পথে নিয়ে যাবে—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর