এবারের নির্বাচন অনেক দিক থেকেই আলাদা। এই নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বড় দল আওয়ামী লীগ নেই। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জনগণ ‘হ্যাঁ’-‘না’ গণভোটেও অংশ নেবে। এবারের নির্বাচন না কোন দলীয় সরকার, না কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনের প্রতিটি স্তর যেন স্বচ্ছ থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতির কথাই জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকার। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সর্বকালের সেরা নির্বাচন পরিচালনার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন দিক আসবে। শেষ মুহূর্তের বিশ্লেষণ বলছে, নির্বাচনে জেন-জি প্রজন্ম ও নারী ভোটারদের অবস্থান ফলাফলের চূড়ান্ত নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে।
২০২৪ সালের বড় আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। সেই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে এবার দেশের নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। বিশেষভাবে নারী ভোটাররা এখন পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বের হয়ে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করছেন। দেশের বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ আসনের রাজনৈতিক পরিবেশ অনুসারে দেখা গেছে, প্রার্থীরা এলাকায় নারী ভোটারদের ওপর নির্ভরশীল। নারী ভোটারদের কারণে শেষ মুহূর্তেও জয়-পরাজয় অনুমান করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যা পুরুষ ভোটারের কাছাকাছি। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে নতুন ভোটার রয়েছেন প্রায় এক কোটি। নতুন ভোটারদের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটি ৩৩ লাখ। ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী নারী ভোটার রয়েছেন ২ কোটি ৬৭ লাখ।
রাজনৈতিক দলগুলো নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নির্বাচনী ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপি নারী ভোটারদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত ফ্রি পড়াশোনা, নারী সাপোর্ট সেল, উদ্যোক্তা সহায়তা, ডে-কেয়ার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারেক রহমান প্রতিটি জনসভায় নারীদের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় আসার পর তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জায়মা রহমান নারী ও জেন-জি প্রজন্মের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে যুক্ত হয়েছেন। তারা সেমিনার ও আলোচনা সভায় নারীর অধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।
জামায়াত ইসলামের নির্বাচনী ইশতেহারে নারী নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এনসিপি নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নারী প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে কর্মজীবী নারীদের বিষয়গুলো নিয়ে জামায়াতের কিছু বিতর্কিত বিষয় প্রকাশিত হওয়ায় এক ধরনের হতাশাও দেখা দিয়েছে।
ইশতেহার দিয়ে নারীদের কতটা আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ‘উই ক্যান’র সমন্বয়ক জানিত আরা হক। তিনি বলেন, ‘‘নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ প্রতিশ্রুতি বা নতুন কিছু দেয়া হয়নি। তবে কর্মজীবী নারীরা ভোটে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এখন দেখার বিষয়, তারা নিজেরা কোন প্রার্থীকে নিরাপদ মনে করে ভোট দেবে।’’
গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের নির্বাচনে ঢাকায় না থাকা শ্রমজীবী নারীদের সংখ্যা বেশি। তৃণমূল নারীরাও নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন। রাজশাহীর গোদাগাড়ি তানোর আসনের নারী ভোটাররা পরিবারের পুরুষদের প্রভাব থেকে বের হয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিচ্ছেন। এলাকায় নারীদের মতামতের পরিবর্তন ভোটের হিসাবকেই পাল্টে দিয়েছে।
খুলনায়, নারীদের ভোট কারা পাবে তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। শ্রমিক এলাকার নারীরা সবচেয়ে বেশি সুইং ভোট দিতে পারেন বলে রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নারী ও তরুণরা যাকে দেশের জন্য নিরাপদ মনে করবে, শেষ বিচারে সেই প্রার্থী বা দলকেই সমর্থন দেবে।
বরিশাল জেলা সবসময়ই নারী ভোটের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে বিএনপির প্রতি প্রবণতা বেশি। কিছু ধর্মভিত্তিক দলের জনপ্রিয়তাও লক্ষ্য করা গেছে। পরিবারে একজন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলেও নারীরা একই রাজনীতিতে প্রবেশ করতে তৎপর নন।
নারীর অধিকার সমুন্নত রাখতে ও নারীবিদ্বেষীদের ক্ষমতায় না আনতে অনলাইনে প্রচারণা লক্ষ্য করা গেছে। ‘নারীবিদ্বেষী ও অবমাননাকর’ বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। নারী সংগঠন, গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনসহ একাধিক সংগঠন প্রধান নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দিয়েছে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু বলেছেন, ‘‘নারীরা ভোটের মাঠে নিরাপদ নয়।’’
অ্যাক্টিভিস্ট মার্জিয়া প্রভা বলেন, ‘‘নারী ভোট ফ্যাক্টর। নারীরা ভোট দিক বেশি বেশি। নারীবিদ্বেষীদের জবাব দিক ব্যালেটে। জামায়াতের নারী ভোট ব্যাংক নৈতিকভাবে ভোট দেবে না।’’ ডাকসু নির্বাচনে নারীরা যে প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তার উদাহরণ সামনে রেখেই তিনি আশাবাদী।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, জেন-জি প্রজন্ম ও নারী ভোটারদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তাদের অংশগ্রহণ এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। নারী ভোটাররা শুধু ভোটের সংখ্যা নয়, দেশের রাজনৈতিক দিশা নির্ধারণেও মূল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছেন।
আকাশজমিন
/ আরআর