আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। ১৯৮৩ সালের এই দিনে প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে জাফর, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ ১০ জন প্রাণ হারান। সেই ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে দেশের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়, যা ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের মাধ্যমে সমাপ্তি পায়।
১৯৮২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার নতুন শিক্ষানীতি প্রস্তাব করে। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান শিক্ষানীতি ঘোষণার আগেই ১৭ সেপ্টেম্বর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সূচনা করেন ছাত্র সংগঠনগুলো। এর ধারাবাহিকতায় ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সচিবালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই কর্মসূচির আগে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে পুলিশ গুলি চালায়, যাতে জাফর, জয়নাল, দীপালী ও কাঞ্চনসহ ১০ জন নিহত হন। আরও অনেক ছাত্র আহত হন। আন্দোলনের তুমুল চাপের মুখে সরকার পরবর্তীতে শিক্ষানীতি বাতিল করে।
সেদিন থেকে প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। দিবসটি শুধু ইতিহাসের স্মৃতিচারণ নয়, বরং বর্তমান প্রজন্মকে শিক্ষানীতি ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সচেতন করার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন প্রতিবছর শিক্ষার অধিকার চত্বরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে। শিক্ষানীতি সংশোধনের দাবিতে সেদিনকার আন্দোলন দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে গণ্য করা হয়।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পেছনে শিক্ষার্থীদের ঐক্য এবং সাধারণ জনগণের সহমর্মিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আন্দোলন শুধু শিক্ষানীতি বাতিলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাকে শক্তিশালী করেছে। ছাত্রদের ঐক্য, সাহস এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা সেদিন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে সত্য প্রকাশ করতে সহায়ক হয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রেরণা পান।
স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা স্মৃতিসৌধে ফুল অর্পণ করেন এবং নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করেন। বিভিন্ন সংগঠন বক্তৃতা ও আলোচনা সভার মাধ্যমে শিক্ষানীতি এবং ছাত্র অধিকার নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করে। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমেও মানুষ তাদের অনুভূতি ও শিক্ষণীয় ঘটনা শেয়ার করে থাকে, যা জনসাধারণের মধ্যে ইতিহাস সচেতনতা বৃদ্ধি করে।
শিক্ষানীতির বিরোধী আন্দোলন এবং পুলিশি গুলিতে নিহতদের স্মরণে প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা marches এবং সভা করে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও নেতৃত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছে যে সুশাসন ও ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না। এছাড়া আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে জনগণের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস ইতিহাসে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করে যে, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণমুখী আন্দোলন সম্ভব এবং সফল হতে পারে। এই দিবস শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রতীক, যা স্মরণ করিয়ে দেয় যে কখনোই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা উচিত নয়। শিক্ষানীতি বাতিলের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ধৈর্য এবং একতার মূল্য প্রমাণিত হয়। ছাত্রদের আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেম আজও নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে আছে।
দিবসটি উপলক্ষে ছাত্রসংগঠনগুলো মূলত শিক্ষা অধিকার চত্বরে সমাবেশ এবং আলোচনা সভার আয়োজন করে। নিহতদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় এবং শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় সচেতন হওয়ার শপথ নেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজেও শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষণীয় বার্তা গ্রহণ করে।
বর্তমান প্রজন্মের জন্য স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। এটি দেখায় যে, কঠোর পরিস্থিতিতেও জনগণ ও শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাভাবিক অধিকার এবং ন্যায়ের জন্য লড়াই করতে পারে। শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সেই আন্দোলন দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। এছাড়া, এই দিবস সমাজে সচেতনতা ও ন্যায়ের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করে।
শিক্ষানীতির বিরোধী আন্দোলন এবং স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস শুধুমাত্র একটি স্মৃতি নয়, বরং দেশের গণতন্ত্র এবং শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতীক। এটি সমাজের সকল স্তরে শিক্ষার গুরুত্ব এবং স্বাধীনতার মূল্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। শিক্ষার্থীদের সাহস ও আত্মত্যাগের ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে রয়েছে।