ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে জাল ভোট পড়েছে ২১.৪ শতাংশ: টিআইবি


আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে জাল ভোট পড়েছে ২১.৪ শতাংশ: টিআইবি

  • আপলোড সময় : সোমবার ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৪:০৫ পিএম

আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়া সত্ত্বেও সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক’ বলে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে এই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হয়েছে কি না—এ নিয়ে ভবিষ্যতে আরও প্রশ্ন উঠবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রার্থীদের হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণের ফল তুলে ধরতে সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে পর্যবেক্ষণের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয় এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন ইফতেখারুজ্জামান।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি জানায়, মাঠপর্যায়ের গবেষণার জন্য দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জালভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ঘটেছে ১২৫টি। এসব তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন অংশীজনের সক্রিয়তা ও উদ্যোগ দৃশ্যমান ছিল; কিন্তু আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি।

টিআইবির সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নির্বাচনের শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনি কার্যক্রমে পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে দল ও জোটের মধ্যে আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।

টিআইবি আরও বলেছে, নির্বাচনি সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার কারণে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে এবং ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করেছে। সংস্থাটি মনে করে, আগের মতো এবারও রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম, পেশীশক্তি, পুরুষতান্ত্রিক এবং গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন। তবে এবার বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার আগের তুলনায় আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

নির্বাচনের অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের প্রয়াস ও সক্রিয়তা দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত এবং নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে কমিশনের ওপর আরোপিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি। টিআইবি দাবি করেছে, ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধির ৫৮টি বিষয়ের মধ্যে কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন।

সংস্থাটি বলেছে, অনলাইন ও অফলাইন প্রচারণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অনিয়ম করলেও কমিশনের সীমাবদ্ধতার কারণে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। এর ফলে নির্বাচনে সব দল ও প্রার্থীর জন্য প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র এবং সব শ্রেণির ভোটারদের জন্য পরিপূর্ণ সম-অধিকারভিত্তিক সুস্থ, নিরপেক্ষ ও নিরাপদ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে নির্বাচনকে সার্বিকভাবে ‘গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু’ বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রার্থীদের ৯৯ শতাংশ আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে। নির্বাচন কমিশন অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অনেক বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “পেছনে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে, তবে আমাদের বিবেচনায় আমরা কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং পাইনি। নির্বাচন তুলনামূলক সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে।”

এ সময় একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচনকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ বলা কতটা যৌক্তিক। জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে বলেছিলেন। তিনি বলেন, “তারা ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের শতভাগ নেতাকর্মী ভোট দেননি—এটা বলার সুযোগ নেই। আমাদের দৃষ্টিতে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।”

তবে একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে এই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হয়েছে কি না—এ নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠবে। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে চলমান বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির কিছু প্রার্থীর ঋণগ্রস্ত থাকার বিষয়ও উঠে আসে। এ বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঋণগ্রস্ত ও ঋণখেলাপি এক নয়। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী যারা ঋণগ্রস্ত, তারা ঋণখেলাপি নন। ফলে আইনগতভাবে তারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে অযোগ্য হন না।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ সামনে আসার পর নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা, আচরণবিধি কার্যকর করার সীমাবদ্ধতা, নির্বাচনি সহিংসতা এবং জালভোটের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ৭০টি নমুনা আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে জালভোটের ঘটনার তথ্য এবং নির্বাচন-পরবর্তী ১২৫টি সহিংসতার ঘটনা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।

অন্যদিকে টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সক্রিয়তা দেখালেও বাস্তব পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংঘাত, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কমিশনের ক্ষমতার প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। টিআইবির মতে, এই সীমাবদ্ধতা নির্বাচনি পরিবেশকে পুরোপুরি সমান সুযোগের মধ্যে আনতে বাধা সৃষ্টি করেছে।

তবে সব সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের মধ্যেও টিআইবি নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু’ বলে উল্লেখ করেছে। এর পাশাপাশি নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বললেও আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠবে—এই বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নীতিগত ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আবার টিআইবির বক্তব্যে উঠে এসেছে, বাস্তবে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী ভোট দিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ না থাকলেও মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের উপস্থিতি একেবারে ছিল না—এমন ব্যাখ্যাও পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধির ৫৮টি বিষয়ের মধ্যে কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন—এই তথ্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার দিকটি সামনে আনে। নির্বাচনে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার পর্যবেক্ষণও বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের সংকটকে আবারও দৃশ্যমান করেছে।

সামগ্রিকভাবে টিআইবির পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ, ভোটার উপস্থিতি, প্রতিযোগিতা এবং নির্বাচন আয়োজনের কাঠামো—সব মিলিয়ে নির্বাচন একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় গ্রহণযোগ্য হলেও অনিয়ম, সহিংসতা, জালভোট এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। আর আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ার বাস্তবতা নির্বাচনকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে আরও বিতর্ক তৈরি করবে বলেই মনে করছে টিআইবি।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর