উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে অন্তত ৪৫ ঋণখেলাপি প্রার্থী এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তাদের মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন এবং সবাই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। তবে দুজনের খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় (চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪) নির্বাচন কমিশন এখনো আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করেনি। ফলে আগামীকাল এমপিদের শপথ অনুষ্ঠানে তারা আমন্ত্রণ পাননি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সংশোধিত আরপিওতে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি কারও ঋণখেলাপি থাকা বা হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, নির্বাচন কমিশন তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে পারবে। ফলে আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপি দেখানো যাবে না—এ মর্মে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ উঠে গেলে তারা এমপি পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তবে স্থগিতাদেশের মেয়াদ থাকা অবস্থায় পুনঃতপশিলের মাধ্যমে একবারে ঋণ শোধ করে দিলে ঝুঁকি কমবে। অন্যদিকে ঋণ নিয়মিত করা কিংবা আদালত স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ালে তারা সাময়িকভাবে ঝুঁকিমুক্ত থাকবেন। কিন্তু সংসদ সদস্য থাকাকালে ব্যাংকের ঋণ আবার খেলাপি হলে বা স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হলে তারা পুনরায় এমপি পদ হারানোর ঝুঁকিতে থাকবেন।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল গত ২৯ ডিসেম্বর। সব প্রার্থীর ঋণের তথ্য যাচাই করে ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) থেকে দুটি তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়। একটি তালিকায় ঋণখেলাপি হিসেবে ৮২ জনকে চিহ্নিত করা হয়। অপর তালিকায় ৩১ জনের নাম ছিল, যারা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে কেবল কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি ইসির আপিল শুনানিতে বাদ পড়েন। বাকি ৩০ জন নির্বাচনে অংশ নেন। আর শুরুতে বাদ পড়া ৮২ জনের মধ্যে ১৫ জন পরবর্তী সময়ে আপিল শুনানি কিংবা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রার্থিতা ফিরে পান। সব প্রক্রিয়া শেষে ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এবার নির্বাচনে স্থগিতাদেশ নিয়ে বিজয়ী ১১ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে চট্টগ্রাম-২ থেকে সারোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৪ থেকে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৬ থেকে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, কুমিল্লা-১০ থেকে মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৯ থেকে মো. আবুল কালাম, বগুড়া-১ থেকে কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-৫ থেকে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, টাঙ্গাইল-৪ থেকে মো. লুৎফর রহমান, ময়মনসিংহ-৫ থেকে মোহাম্মদ জাকির হোসেন, মৌলভীবাজার-৪ থেকে মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং সিলেট-১ থেকে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর রয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রার্থিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আদালত কি তাহলে যারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য নয়, তাদের বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দিলেন? তাঁর মতে, এর মাধ্যমে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে গেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান হলেও ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের জেলে যেতে দেখা যায়, আর প্রভাবশালীরা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করা সাময়িক সমাধান। স্থায়ী সমাধানের জন্য ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতপশিলের মাধ্যমে নিয়মিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আকাশজমিন / আরআর