ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সরলো বঙ্গবন্ধুর একক ছবি, যুক্ত হলো জিন্নাহ ও জুলাই অভ্যুত্থান মমেকের ৩য় তলায় শিশু ওয়ার্ডে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস শিল্পে গ্যাস সরবরাহ মঙ্গলবার থেকেই স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রধানমন্ত্রীর ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাব ছাড়াল ১ লাখ ৪১ হাজার কাশফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, অনেকের জীবিকাও বটে তাড়াশে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ৮টি গরু চুরি, নিঃস্ব কৃষক পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৭৩৩ জন ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের অনানুষ্ঠানিক মেয়র প্রার্থী ঘোষণা চারবার গুলিবিদ্ধ ও তিনবার কারাবরণ: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় ইশরাক অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান

একসঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান ও উপ-প্রধানকে হারাল ইরান


একসঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান ও উপ-প্রধানকে হারাল ইরান

  • আপলোড সময় : বুধবার ১৮ মার্চ, ২০২৬ সময় : ১২:০৮ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুতই তীব্র হয়ে উঠছে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত। চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে হামলা ও পাল্টা হামলার মাত্রা প্রতিদিনই বাড়ছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বড় ধাক্কা খেল ইরান। দেশটি একসঙ্গে হারিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি এবং উপ-প্রধান আলীরেজা বায়েত ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাতে সংঘটিত ওই হামলায় দুজনই প্রাণ হারান বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। ইরানের বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

চলমান যুদ্ধের প্রায় ২০ দিনের মাথায় এই ঘটনা ঘটলো, যা ইরানের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাতে একাধিক শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হারানোর পর এবার জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার মৃত্যু দেশটির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রথমে ইসরায়েল দাবি করে যে তারা একটি লক্ষ্যভেদী হামলার মাধ্যমে আলী লারিজানিকে হত্যা করেছে। পরে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করে যে, মঙ্গলবার রাতে ইসরায়েলি হামলায় আলী লারিজানি নিহত হয়েছেন। ওই হামলায় তার ছেলে এবং একজন সহকারীও প্রাণ হারান।

এর কিছু সময় পর ইরানি কর্তৃপক্ষ জানায়, নিহত ওই সহকারী আসলে নিরাপত্তা পরিষদের উপ-প্রধান আলীরেজা বায়েত। অর্থাৎ একই হামলায় জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

আলী লারিজানির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। এক বিবৃতিতে পরিষদ বলেছে, “ইরান ও ইসলামি বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য আজীবন সংগ্রামের পর তিনি অবশেষে তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে অত্যন্ত গৌরবের সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তিনি শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছেন।”

ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে আলী লারিজানি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যুতে দেশটির ক্ষমতার কাঠামোতে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান। ইরান ইতোমধ্যেই কঠোর প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। দেশটির নেতারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এবার ‘চূড়ান্ত জবাব’ দেওয়া হবে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই পাল্টা হামলা শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত ইসরায়েলি ও মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে।

এর আগে সংঘাতের শুরু থেকেই ইরান ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালিয়ে আসছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিতিশীলতা আরও বেড়ে গেছে।

আলী লারিজানি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। ২০২৫ সালের অগাস্টে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাকে এসএনএসসি’র সচিব এবং পরিষদে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন।

ইরানি গণমাধ্যমগুলোতে তাকে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবেও উল্লেখ করা হতো। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ইরানের রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

২০০৮ সালের মে থেকে ২০২০ সালের মে পর্যন্ত টানা ১২ বছর তিনি ইরানের সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তিনি দেশটির অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি প্রিন্সিপলিস্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সংসদে এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে একজন মধ্যপন্থি রক্ষণশীল রাজনীতিক হিসেবে দেখা যেতে থাকে।

স্পিকার হওয়ার আগেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আলী লারিজানি। সে সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

লারিজানি পরিবারেরও ইরানের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান রয়েছে। তার ভাই সাদেঘ লারিজানিও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সভাপতিত্ব করেন, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সালিশি সংস্থা।

এই সংস্থাটি সংসদ এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। ফলে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় লারিজানি পরিবারের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।

অন্যদিকে আলীরেজা বায়েত সম্পর্কে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ কিন্তু প্রচারবিমুখ প্রশাসক। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

নিরাপত্তা পরিষদে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ইরানের হজ ও তীর্থযাত্রা সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও সংগঠনিক সক্ষমতার জন্য তিনি সরকারি মহলে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ব্যর্থ আলোচনার পর। গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সংলাপ চলে।

কিন্তু ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো সমঝোতা ছাড়াই সেই আলোচনা শেষ হয়। আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

এর পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। একই সময়ে ইসরায়েলও ইরানে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে পৃথক সামরিক অভিযান শুরু করে।

এই যৌথ সামরিক অভিযানের প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা। একইসঙ্গে ইরানের সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডারও নিহত হন।

এই ঘটনার পর থেকেই ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুরু করে। ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে তেহরান।

প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা এই হামলা-পাল্টা হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আলী লারিজানি এবং আলীরেজা বায়েতের মৃত্যু ইরানের জন্য বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত ধাক্কা। তবে একইসঙ্গে এটি সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠোর জবাব দিয়ে আসছে ইরান। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর দুই শীর্ষ নেতাকে একসঙ্গে হারানো নিঃসন্দেহে দেশটির জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর