আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গাজাসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক ফ্রন্টে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। বর্তমানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের পাশাপাশি লেবাননে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও বড় পরিসরে হামলা চালাচ্ছে দেশটি। একই সঙ্গে ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও পরিস্থিতি অনুযায়ী হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রায়ই প্রশ্ন উঠছে—ইসরায়েল এত বিপুল অস্ত্রশস্ত্র কোথা থেকে পায় এবং কোন কোন দেশ তাদের অস্ত্র সরবরাহ করে।
ইসরায়েলের অস্ত্র সরবরাহের প্রধান উৎসের একটি হলো তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বৃহৎ পরিসরে নিজস্ব অস্ত্রশিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটি আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রশিল্প গড়ে তোলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্প আরও বিস্তৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে।
বর্তমানে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি সরঞ্জাম, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা-গোলাবারুদ, ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান, রাডার, সাইবার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং সামরিক স্যাটেলাইট তৈরিতে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা অর্জন করেছে ইসরায়েল। নিজস্ব উৎপাদন বাড়িয়ে প্রতিরক্ষা খাতে আরও স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে দেশটি বড় ধরনের বিনিয়োগও করছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ডিসেম্বরে ঘোষণা দেন, আগামী ১০ বছরে নিজস্ব অস্ত্রশিল্প আরও শক্তিশালী করতে ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে।
শুধু অস্ত্র উৎপাদনই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্ত্র রপ্তানিতেও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে ইসরায়েল। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক অস্ত্র স্থানান্তরের প্রবণতা ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সময়কালে বৈশ্বিক অস্ত্র রপ্তানিতে ইসরায়েলের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০১৬–২০২০ সময়কালের তুলনায় এই পাঁচ বছরে ইসরায়েলের অস্ত্র রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।
ইসরায়েলের তৈরি উল্লেখযোগ্য সামরিক প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে আয়রন ডোম, ডেভিড’স স্লিং এবং অ্যারো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এসব প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
এসআইপিআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২০২৫ সময়কালে ইউরোপের ২৩টি, এশিয়া ও ওশেনিয়ার ১০টি, আফ্রিকার ৭টি, আমেরিকার ৫টি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ২টি দেশে অস্ত্র রপ্তানি করেছে ইসরায়েল। এসব অস্ত্রের ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে ভারত, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মরক্কো।
রপ্তানির পাশাপাশি অস্ত্র আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। এসআইপিআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২০২৫ সময়কালে বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানিতে ইসরায়েলের অংশ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে দেশটি বিশ্বের ১৪তম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক হিসেবে উঠে এসেছে।
ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র। নিউজউইকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল যে অস্ত্র আমদানি করে তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এসআইপিআরআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১–২০২৫ সময়ে ইসরায়েলের আমদানি করা অস্ত্রের প্রায় ৬৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে।
এই অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ও গাইডেড বোমা। জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্তত ৫৫টি যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল। এর মধ্যে ৩০টি এফ–৩৫ এবং ২৫টি এফ–১৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে, যেগুলো ২০২৬ সালে সরবরাহ করার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জার্মানি ও ইতালিও ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। এসআইপিআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২০২৫ সময়কালে ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানির প্রায় ৩১ শতাংশ এসেছে জার্মানি থেকে। ইতালি থেকেও সীমিত পরিমাণে অস্ত্র আমদানি করেছে দেশটি।
তবে গাজা যুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশ ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে আংশিক বা পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। জার্মানি গাজায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। ইতালিও নতুন অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করেছে, যদিও আগের চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, বেলজিয়াম ও স্লোভেনিয়াসহ কয়েকটি দেশও ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। তবু বিশ্লেষকদের মতে, এসব নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রভাব সীমিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি পুরোনো চুক্তি কার্যকর থাকায় অস্ত্র সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইসরায়েল নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনও দ্রুত বাড়িয়ে চলেছে।