মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার কারণে সম্ভাব্য জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় জাতীয় মজুদ থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহ থেকেই এই তেল সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হবে।
জানা গেছে, গত সপ্তাহে জাপান সরকার বেসরকারি খাতের মজুদ থেকে ১৫ দিনের সমপরিমাণ তেল ছাড়ার অনুমোদন দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে এর প্রভাব সরাসরি জাপানের ওপর পড়তে পারে।
সরকারি সূত্রে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মজুদ থেকেও তেল ছাড়ার কার্যক্রম বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশটির জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং বাজারে সম্ভাব্য সংকট প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক সম্পদে দরিদ্র হলেও জাপান বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ। তাদের মোট অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বান সত্ত্বেও ওই অঞ্চলে নৌবাহিনী না পাঠানোর সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন সানায়ে তাকাইচি। তিনি জানান, জাপানের যুদ্ধোত্তর সংবিধান এমন সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। পাশাপাশি তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্বের ওপর জোর দেন এবং বলেন, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা শুধু জাপানের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ৪৫ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ বা প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল তেল দেশীয় শোধনাগারগুলোকে সরবরাহ করা হবে। এই পরিমাণ তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত জাপানের ইতিহাসে অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১১ সালে ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, তার তুলনায় এটি প্রায় ১.৮ গুণ বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের শেষে জাপানের মোট তেল মজুদ ছিল প্রায় ৪৭ কোটি ব্যারেল, যা দেশটির প্রায় ২৫৪ দিনের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এই বিশাল মজুদ দেশটিকে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দেয়।
এ ছাড়া জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে জাপান সরকার পেট্রলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম প্রায় ১৭০ ইয়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর আগে এই দাম বেড়ে রেকর্ড ১৯০.৮ ইয়েনে পৌঁছেছিল, যা সাধারণ জনগণের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করেছিল।
সামগ্রিকভাবে, জাপানের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ধরনের উদ্যোগ অন্যান্য দেশকেও অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করতে পারে।