মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে ফিলিপাইন। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিপাইন জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত নির্ভরশীল একটি দেশ। দেশটির মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৮ শতাংশই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে সরাসরি এর প্রভাব পড়ে দেশটির জ্বালানি বাজারে।
গত তিন সপ্তাহে ফিলিপাইনে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফা বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে এবং অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার নির্বাহী এক আদেশ জারি করেন ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। ওই আদেশে তিনি দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ‘আসন্ন বিপদের’ সতর্কতা তুলে ধরেন। প্রেসিডেন্ট জানান, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে সম্ভাব্য ধাক্কা থেকে রক্ষা করার জন্যই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকার এখন জ্বালানি খাতে প্রয়োজনীয় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি ক্ষমতা পেয়েছে। এর ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, মজুত বাড়ানো এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারবে।
নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেল, খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সুশৃঙ্খল বণ্টন নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নির্দেশনা দেবে।
এছাড়া সরকারকে সরাসরি জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কেনার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ এবং মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফিলিপাইনের জ্বালানি মন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমান ব্যবহারের হার অনুযায়ী দেশটির কাছে মাত্র ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। এই সীমিত মজুত পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ আরও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিলিপাইনের এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সম্ভাব্য প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর আরও অনেক দেশ একই ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।
নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের ঘোষিত এই জ্বালানি জরুরি অবস্থা এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতির ওপর ভিত্তি করে প্রেসিডেন্ট চাইলে এই সময়সীমা বাড়াতে কিংবা প্রত্যাহার করতে পারবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ইতোমধ্যে চাপের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফিলিপাইনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
সূত্র: আল জাজিরা
আকাশজমিন / আরআর