ইরানের সঙ্গে আকস্মিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে সময়ক্ষেপণ করছেন বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, আগামী শুক্রবার ঘোষিত সময়সীমার আগে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের সুযোগ তৈরি করতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
গত ২৩ মার্চ থেকে ট্রাম্প প্রশাসন আকাশপথে হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখলেও সমুদ্র ও আকাশপথে মার্কিন সামরিক শক্তি দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও দুই ইউনিট মেরিন সেনা, যাদের সদস্যসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার।
এই যুদ্ধপ্রস্তুতির মধ্যেই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “শুক্রবার যদি কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তবে আমরা আমাদের ‘তৃপ্তি’ না হওয়া পর্যন্ত বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাব।”
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন কেবল আকাশপথে হামলায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। পেন্টাগনের টেবিলে এখন আরও আক্রমণাত্মক কয়েকটি পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ খরগ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। ফলে দ্বীপটি দখলে নিতে পারলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধ্বংসে বিশেষ সামরিক অভিযানের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিশ, কেশম ও হরমুজ দ্বীপপুঞ্জকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা রয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২২০০ মেরিন সেনা বহনকারী যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ শুক্রবারের মধ্যেই পারস্য উপসাগরে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে সংঘাত শুরুর পর প্রথমবারের মতো ইরানের মাটিতে পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান চালানোর সক্ষমতা অর্জন করবে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রওনা হওয়া ‘ইউএসএস বক্সার’ এপ্রিলের মধ্যে এই অঞ্চলে যোগ দিতে পারে।
এদিকে ট্রাম্পের আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান জানিয়েছে, অতীতে দুইবার ট্রাম্প প্রশাসনের কথায় বিশ্বাস করে তারা প্রতারিত হয়েছে। তাই এবার তারা কোনো ফাঁদে পা দিতে চায় না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং মার্কিন হামলার জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা সুয়েজ খালের আদলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজ থেকে শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা করছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন সতর্ক করেছে, ইরানের খরগ দ্বীপ বা অন্য কোনো ভূখণ্ডে স্থল অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিমান হামলায় দ্বীপের রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হেলিকপ্টার বা এফ-৩৫বি জেটের মাধ্যমে সেনা নামাতে হবে। কিন্তু ইরানের হাতে থাকা বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কারণে এমন অভিযানে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আকাশজমিন / আরআর