আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন দাবি করলেও বিশ্লেষকরা এর প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘমেয়াদে ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়ে যেতে পারে এবং এর অর্থনৈতিক ধাক্কা ও বিপর্যয় এখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল আলফা পার্টনার্সের বিশ্লেষক বাইরন ক্যালান একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন আরও বিস্তৃত ও গভীর হচ্ছে।’ তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ২৫ শতাংশ, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা ৪৫ শতাংশ, এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়ানোর আশঙ্কা ৩৫ শতাংশ।
এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে ইরাকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সঙ্গে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর লড়াই হচ্ছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে তেহরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হুমকি হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি ক্রমেই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব ফেলছে। প্রণালি প্রায় অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ইরানের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলা বাড়ায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য এক মাসে প্রায় এক ডলার বেড়ে প্রতি গ্যালনে প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে, যা অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। ঋণের বিপরীতে সুদের হার বৃদ্ধি পেলে আবাসন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
স্থল অভিযান নিয়ে বিশ্লেষক বাইরন ক্যালান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হানতে পারবে—এ ধরনের ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তিনি ৭৫ শতাংশ সম্ভাবনা দেখেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূখণ্ডে সেনা মোতায়েন করতে পারে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার উদ্দেশ্যে।
এই ধরনের অভিযানে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তবে সেখানে স্থলবাহিনী পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হবে। কারণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা রয়েছে। ক্যালানের ভাষায়, ‘খারগ দ্বীপ দখল করা কিছুটা অযৌক্তিক মনে হয়। সেখানে জ্বলতে থাকা তেল স্থাপনাগুলো দখলকারী বাহিনীর জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।’
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যদি ইরানের হাতে থাকে, তা উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরবও এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিক আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, আমাদের এমন সমাধান দরকার যা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং পারমাণবিক হুমকি, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রণালির ওপর আধিপত্য বন্ধ করবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, যদি কোনো সমঝোতা চুক্তির কারণে ইরানকে হরমুজ প্রণালির ‘প্রহরী’ হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সংঘাত থামার বদলে আরও তীব্র হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোও সক্রিয় ভূমিকা নিতে বাধ্য হতে পারে।
যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে বাধ্য। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি ও তেল কেন্দ্রে হামলার কারণে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হলে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।
এতে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা কমে যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলো সঙ্কটমুক্ত করতে কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখন পর্যন্ত সমঝোতার কোনো কার্যকর চুক্তি হয়নি। তেহরান-ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষক বাইরন ক্যালান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে রাজনৈতিকভাবে দমন করতে পারলেও স্থল অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে খারগ দ্বীপে অভিযান সফল হলেও সেখানে তেল স্থাপনাগুলোর ধ্বংস হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক তেল বাজারে বিশাল ধাক্কা আনবে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোও যুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ইরানের প্রভাব ও জ্বালানি সংকট এই সংঘাতকে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দীর্ঘায়িত সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দামের উত্থান এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে।
বাইরন ক্যালানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ মে মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তা কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে, তবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে বাধ্য।
আকাশজমিন / আরআর