ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগছে, কারণ দেশটি এখনো নিজেদের অবস্থানে অত্যন্ত অনড় এবং আত্মবিশ্বাসী—এমন মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানি নেতারা মানসিকভাবে অত্যন্ত ‘শক্তিশালী’ এবং ‘অহংকারী’। তবে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শেষ পর্যন্ত তাদের যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্ত মেনে চুক্তিতে আসা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প উপায় থাকবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘তারা শক্তিশালী, তারা গর্বিত। এমন কিছু নীতিগত বিষয় আছে, যা তারা অতীতে কখনো করবে বলে ভাবেনি, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এখন তাদের তা করতে হবে। কারণ তাদের সামনে আর কোনো দ্বিতীয় বিকল্প খোলা নেই। তবে এসব জটিল বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে।’
গত এপ্রিল মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে এবং তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তবে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনো যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এনবিসি নিউজের ওই সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোরালো দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শক্তিশালী সামরিক অভিযানের কারণে ইরানের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, তেহরানের অধিকাংশ ড্রোন তৈরির কারখানা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং প্রধান প্রধান উৎপাদন স্থাপনা মার্কিন হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য ট্রাম্প এটিও স্বীকার করেছেন যে, ইরানের হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের সামরিক শক্তিকে আমরা বিমান হামলার মাধ্যমে কার্যত ধ্বংস করে দিয়েছি। তবুও স্বীকার করতে হবে যে, কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এখনো তাদের মজুদে রয়ে গেছে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা এবং গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় দেশটির কাছে যে পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, তার প্রায় ২১ থেকে ২২ শতাংশ এখনো তাদের হাতে অক্ষত অবস্থায় আছে।’ ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন, কয়েক মাস ধরে চলা এই বিধ্বংসী সংঘাতের একটি দ্রুত এবং স্থায়ী সমাধান তিনি মনেপ্রাণে চাইলেও বাস্তব পরিস্থিতি হলো—দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত শত্রুতা একদিনে শেষ করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধটি কয়েক দশকের পুরোনো এবং একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে দুই পক্ষকেই গভীর ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, মূলত তা নিশ্চিত করতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত যদি কোনো ফলপ্রসূ চুক্তি না হয়, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অন্য বিকল্প পথও খোলা রয়েছে বলে কড়া ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প অত্যন্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমাদের এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে—উভয়পক্ষের মধ্যে একটি কার্যকর চুক্তি হবে, নাকি আমাদের অন্য কোনো পথে হাঁটতে হবে। আর আমি পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, সেই অন্য পথটি কিন্তু ইরানের জন্য মোটেও সুখকর হবে না।’