বিশ্বকাপে ইরানের পুরো যাত্রাটিই ছিল নানা নাটকীয়তা ও বৈষম্যে ভরা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর দলটির বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়েই তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ভূরাজনৈতিক বৈরিতার সব বাধা পেরিয়ে ইরান টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও মাঠ ও মাঠের বাইরে তাদের চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই তারা ড্র করে। বিশেষ করে মিসরের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে জয়ের একদম কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল এশিয়ান পরাশক্তিরা। তবে শেষ মুহূর্তে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত অফসাইডের সিদ্ধান্তের কারণে তারা জয় থেকে বঞ্চিত হয়, যার ফলে শেষ ৩২-এ ওঠার ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া করে বিদায় নিতে হয় দলটিকে। টুর্নামেন্ট চলাকালীনই মার্কিন কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে একাধিকবার ক্ষোভ উগরে দিয়েছে ইরানের ফুটবল ফেডারেশন। দলের প্রধান কোচ আমির ঘালেনোই আক্ষেপ করে তাঁর দলকে এই বিশ্বকাপের ‘সবচেয়ে নিপীড়িত’ দল হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। কোচ দাবি করেন, রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে ফেলে অন্য দলগুলোর তুলনায় ইরানকে প্রয়োজনের চেয়ে অর্ধেকেরও কম অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। মিসরের সঙ্গে ড্র করে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার পর ইরান অধিনায়ক মেহদী তারেমি নিজের ক্ষোভ লুকিয়ে রাখতে পারেননি। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানান, এটি ছিল একটি জঘন্য বিশ্বকাপ এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার উচিত ছিল শুরু থেকেই দলগুলোর ওপর রাজনৈতিক হয়রানির সমাধান করা, যা তারা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
ইরান দলের প্রতি মার্কিনদের অমানবিক আচরণের একটি বড় উদাহরণ ছিল তাদের আবাসন ও ক্যাম্পিংয়ের সমস্যা। ইরান প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার টুকসনে তাদের অফিশিয়াল ক্যাম্প করতে চেয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক জটিলতায় গত মে মাসে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিহুয়ানায় ক্যাম্প স্থানান্তর করতে তারা বাধ্য হয়। ইরানের তিনটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যার মধ্যে প্রথম দুটি লস অ্যাঞ্জেলেসে এবং শেষটি সিয়াটলে। প্রতি ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সুযোগ না দিয়ে দ্রুত মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হতো। এই অমানবিক চুক্তি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন কর্মকর্তা মার্কওয়েন মুলিন সাফ জানান, খেলা শেষে তাদের চলে যেতে হবে, এটাই ছিল পূর্ব চুক্তি। তিনি উল্টো দাবি করেন, ইরানের খেলোয়াড় ছাড়া প্রতিনিধিদলের প্রায় অর্ধেক সদস্যের সঙ্গে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সরাসরি সম্পর্ক ছিল, যা তাদের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখতে বাধ্য করেছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে ফুটবলের সবুজ গালিচাতেও এখন রাজনীতির নোংরা থাবা কতটা গভীর।
আকাশজমিন / আরআর