ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রধান স্তম্ভ, সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিদায়ী মহাপ্রস্থানের আনুষ্ঠানিকতা এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন আবহে এগিয়ে চলছে। তেহরানে লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধার পর্ব শেষ করে আজ এই মহান নেতার মরদেহ নেওয়া হচ্ছে ইরানের ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র শহর কোমে। সেখানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে তার জানাজার নামাজ সম্পন্ন করার পর একটি সুবিশাল শোক র্যালির আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম আইআরএনএর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক শোকযাত্রার বিস্তারিত সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। পুরো ইরান জুড়ে এখন চলছে শোকের মাতম এবং রাষ্ট্রীয় এই শেষ বিদায়ে অংশ নিতে দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ ছুটে আসছেন নির্দিষ্ট গন্তব্যগুলোতে।
কোম অঞ্চলের গভর্নর জেনারেল আকবর বেহনামজু এই বিদায়ী আয়োজনের রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রয়াত এই শহীদ নেতার দ্বিতীয় জানাজার নামাজ মঙ্গলবার ভোর সকাল ৬টায় কোমের অত্যন্ত পবিত্র ও ঐতিহাসিক জামকারান মসজিদে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খামেনির আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই জানাজায় স্মরণকালের সবচেয়ে বড় মানবসমাগম এবং রেকর্ডসংখ্যক মানুষের ঐতিহাসিক উপস্থিতি আশা করছে স্থানীয় প্রশাসন। গভর্নর আরও স্পষ্ট করেন যে, পবিত্র কোম শহরে এই প্রয়াত নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো এবং জানাজার যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও নিখুঁত লজিস্টিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। জানাজার মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে মূল শোক র্যালিটি। এই সুবিশাল পদযাত্রাটি কোমের বিখ্যাত পায়াম্বার-এ আজম বুলেভার্ড সড়ক থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে হযরত মাসুমেহ (আ.)-এর পবিত্র মাজার শরিফের দিকে অগ্রসর হবে।
কোম শহরে এই মরদেহ নিয়ে আসার আগে, রাজধানী তেহরানে খামেনির প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসার এক নজিরবিহীন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। সোমবার স্থানীয় সময় ঠিক সকাল ৬টায় তেহরানের বিখ্যাত ও সুবিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণ থেকে একটি ঐতিহাসিক শোক র্যালির সূচনা করা হয়েছিল। এই বিশালাকার কমপ্লেক্সের ভেতরেই সর্বসাধারণের শেষ দেখা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের সুবিধার্থে খামেনির মরদেহ টানা দুই দিন ধরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয়েছিল, যেখানে লাখ লাখ মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে শেষবার দেখতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তেহরানের এই চূড়ান্ত বিদায়ী আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশাল এই শোক র্যালিটি পুরোপুরি সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ এই বিশাল মানবতরঙ্গ দামাভান্দ স্ট্রিট, ঐতিহাসিক ইমাম হুসেন স্কয়ার, ইনকিলাব স্ট্রিট, বিখ্যাত আজাদি স্ট্রিট ও আজাদি স্কয়ার হয়ে মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থিত শহীদ লাশগরি হাইওয়ে পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ব্যস্ত ও প্রধান পথ অতিক্রম করবে।
এর আগে গত রোববার ইরানের অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী ইমাম হিসেবে শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রথম জানাজার নামাজে ইমামতি করেছিলেন। এই একই জানাজায় তার সঙ্গে মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়া খামেনির জামাতা ড. মেসবাহ-উল-হোদা বাঘেরি-কানি, তার প্রিয় কন্যা জাহরা হাদ্দাদ-আদেল, তার মাত্র ১৪ মাস বয়সী অবুঝ নাতনি জাহরা মোহাম্মদী-গোলপায়েগানি এবং সাইয়্যেদেহ বুশরা হোসেইনির কাফন জড়ানো মরদেহের জানাজাও একসঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য পুরো ইরানবাসীর চোখকে অশ্রুসিক্ত করে তুলেছিল। ইরানের অন্যতম প্রধান গণমাধ্যম প্রেস টিভি তাদের বিশেষ বুলেটিনে জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খামেনির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে আন্তর্জাতিক নেতাদের ঢল নেমেছে। রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, তাজিকিস্তান এবং তুরস্কসহ বিশ্বের বহু প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কূটনৈতিক কর্মকর্তারা খামেনির এই মহাপ্রস্থানে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং তাদের প্রেরিত প্রতিনিধিদলগুলো ইতিমধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তেহরানে অবস্থান করছে।
ইরানের কোম শহরে মঙ্গলবারের যাবতীয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও জানাজা শেষ হওয়ার পর, পরবর্তী সূচি অনুযায়ী খামেনির মরদেহকে অন্য এক ঐতিহাসিক শোকযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হবে। বুধবার তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের পবিত্র ভূমি নজফে, যেখানে অবস্থিত ইসলামের প্রথম সারির খলিফা ও ইমাম আলীর পবিত্র মাজার শরিফে তার মাগফিরাত কামনা করা হবে। এরপর সেখান থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কারবালার ঐতিহাসিক প্রান্তরে, যেখানে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পবিত্র মাজার ও হযরত আব্বাসের পবিত্র মাজারে বিশেষ জিয়ারত সম্পন্ন করা হবে। ইরাকের এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলোতে খামেনির বিদায়ী সফর শেষে তার মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। খামেনির জীবদ্দশায় প্রকাশ করা ব্যক্তিগত শেষ ইচ্ছানুযায়ী, আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজার পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণের নির্দিষ্ট এক স্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত বা দাফন করা হবে। এর মধ্য দিয়েই অবসান ঘটবে ইরানের এক দীর্ঘ ও প্রভাবশালী ঐতিহাসিক অধ্যায়ের।