মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যখন এক নতুন সমীকরণের হাওয়া বইছে, ঠিক তখনই ওমান উপকূলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে রহস্যজনক ও আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমেরিকার সাথে ইরানের একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আবহেই এই নাশকতার খবর সামনে এলো। মঙ্গলবার কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক জাহাজ চলাচল ও নৌপথ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের উপকূলীয় অঞ্চল লিমাহর পূর্ব দিকে একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত কোনো বস্তুর নিখুঁত আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্থাটির বিবরণ অনুযায়ী, ওমান উপকূলের কাছাকাছি থাকা অবস্থায় ওই ট্যাংকারটি লক্ষ্য করে অজ্ঞাত কোনো স্থান থেকে একটি প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এর ফলে জাহাজটিতে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন ধরে যায়। হামলার মুখে পড়ার সময় ট্যাংকারটি দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হচ্ছিল এবং উপকূল থেকে ঠিক ৮ নটিক্যাল মাইল পূর্বে এই ঘটনাটি ঘটে। ইউকেএমটিও আরও যোগ করেছে যে, প্রজেক্টাইলটি ট্যাংকারটির বাম পাশে সরাসরি আঘাত হেনেছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত কিংবা বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের খবর পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জোর তদন্ত শুরু করেছে।
এই হামলার ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী সমস্ত বিদেশি জাহাজের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইরানের সামরিক কমান্ডের নির্ধারিত ও অনুমোদিত নিরাপদ রুট ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথে যদি কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি পারাপারের চেষ্টা করে, তবে তাদের ‘কঠোর ও নির্মম জবাব’ দেওয়া হবে। এর আগে ইরানের সামরিক কমান্ডও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নির্ধারিত জলসীমার পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক নৌ প্রোটোকল অমান্য করার মতো যেকোনো ঘটনার বিরুদ্ধে তাদের সশস্ত্র বাহিনী তাৎক্ষণিক সামরিক ব্যবস্থা নেবে। এই কড়া নির্দেশনা যারা অমান্য করবে, সেই সব জাহাজের নিরাপত্তার কোনো গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা তেহরান দেবে না।
ইরানের এই শক্ত অবস্থান মূলত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একটি সাম্প্রতিক বিবৃতির পর আরও জোরালো হয়েছে। সেন্টকম জানিয়েছিল, বাহরাইনে আয়োজিত একটি নিরাপত্তা সংলাপে আঞ্চলিক নেতারা এই সামুদ্রিক রুটে বাণিজ্যের অবাধ ও নিরাপদ প্রবাহ নিশ্চিত করার প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি মার্কিন সেন্টকমের এই বিবৃতির তীব্র সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আমেরিকার সামরিক ছত্রছায়ায় পারস্য উপসাগরে কোনো আইনি শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বরং বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ, এলাকা থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত হতে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সাথে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। যুদ্ধ পরবর্তী ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তিতে রূপ দিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বর্তমানে যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, তাতে এই নৌপথের নিরাপত্তাই এখন প্রধান দরকষাকষির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেরিটাইম ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট মেরিনট্র্যাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রণালিতে অন্তত ৮৯টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে অতি সম্প্রতি সিঙ্গাপুর ও পানামার পতাকাবাহী দুটি জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনাও রয়েছে, যার জন্য পশ্চিমা বিশ্ব তেহরানকেই দায়ী করে আসছে। গত ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার পর এই রুটে জাহাজ চলাচল কিছুটা বাড়লেও, তা যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে এখনও অনেক কম।