আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত ভর্তি পরীক্ষা নিটসহ একাধিক মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বেআইনিভাবে ফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনায় গুরুতর কারিগরি ত্রুটি এবং বারবার পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তরুণদের অনলাইনে গড়ে ওঠা 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) নামক একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীদের রাজপথের এই অভাবনীয় আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর ও পার্লামেন্ট স্ট্রিট সংলগ্ন গোটা এলাকায় হাজার হাজার ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন, যা ইতিমধ্যে আন্দোলন হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ভারতজুড়ে।
গত সোমবার শিক্ষার্থীরা পার্লামেন্ট অভিমুখে এক গণমিছিল বের করলে পথিমধ্যে পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয় এবং সহিংস সংঘর্ষে অন্তত শতাধিক শিক্ষার্থী মারাত্মক আহত হন বলে সিজেপি দাবি করে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অহিংস পদযাত্রায় পুলিশ অকাতরে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও নির্মম লাঠিচার্জ চালিয়েছে। পুলিশি এই দমনপীড়নের কঠোর সমালোচনা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ' এবং 'অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল'।
ছাত্রনেতাদের সার্বিক তিন দফা দাবির মধ্যে অন্যতম প্রধান দাবিগুলো হলো— শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাত্ক্ষণিক পদত্যাগ, আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কর্তৃক দায়ের করা সব ধরণের হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের করুণ ট্র্যাজেডিতে আত্মহনন করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে উপযুক্ত সরকারি ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।
এদিকে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে একটানা ২৬ দিন ধরে আমরণ অনশনে থাকা বিখ্যাত লাদাখি পরিবেশকর্মী ও উদ্ভাবক সোনাম ওয়াংচুক অবশেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর অনশন ভাঙেন। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং নতুন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের সরাসরি উপস্থিতিতে তাঁদের হাত থেকে ডাবের পানি পান করে নিজ অনশন কর্মসূচির ইতি টানেন ওয়াংচুক।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অনশন ভাঙ্গার পর সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্বাস দিয়ে বলা হয়েছে যে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশি কোনো মামলা দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে মানসিক চাপে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য মানবিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পরিবেশকর্মী ওয়াংচুকের অনশন সমাপ্তির পর সরকারের দুই জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এবং সিজেপির দুই প্রধান ছাত্রনেতার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের এক ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকের ফলে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় এই জটিল সংকটের কার্যকর সমাধানের এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, চরম উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, দেশের তরুণ সমাজের সুসংহত ভবিষ্যৎ ও সার্বিক কল্যাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই সরকারের কাছে হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অনৈতিক চক্রে জড়িত মূল অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ সাজা দিতে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠন করা হবে বলে জানান তিনি।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসকে নিতান্তই অপ্রতুল ও লোকদেখানো মন্তব্য করে প্রত্যাখ্যান করেছে সিজেপি। সংগঠনটির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা মূলত মূল আন্দোলন ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের প্রধান দাবি থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরানোর এক অপকৌশল মাত্র। আর সিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অভিজিৎ দীপকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মোদি সরকার আন্দোলনের মুখ বন্ধ করতে প্রয়োজনে পুরো দিল্লি শহর বন্ধ রাখতে রাজি, কিন্তু কোনোভাবেই বিতর্কিত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদ থেকে সরাতে রাজি নয়।
ছাত্রনেতারা জানিয়েছেন, পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কেন্দ্র সরকার আগামী শনিবার বিকেল পর্যন্ত চূড়ান্ত সময় চেয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে সরকার স্পষ্টভাবে দাবি করেছে, কোনো রাজনৈতিক অহমিকা নয়, বরং খোলামেলা আলোচনার মধ্য দিয়েই বিদ্যমান এই সংকট থেকে উত্তরণ চায় তারা।