ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬,  ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১২ জনের মৃত্যুতে উদ্বেগ

খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৩ হাজার পেরোল


  • আপলোড সময় : রবিবার ১৬ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৯:০০ এএম

খুলনা অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দুই ডজনেরও বেশি হাসপাতালে যেখানে প্রায় ৩০০ জন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে প্রতিনিয়ত সরকারি হাসপাতালেই তিন শতাধিক রোগী ভর্তি থাকছেন। শহরের পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকেও ক্রমাগত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটছেন সাধারণ মানুষ। তবে ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বেশি হওয়ায় শয্যাসংকটে পড়েছেন তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে আলাদা ডেঙ্গু ইউনিট চালু করেও এই অস্বাভাবিক চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন ক্রমবর্ধমান রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে মারাত্মক হিমশিম খাচ্ছেন খুলনা অঞ্চলের চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।


পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি নাজুক রূপ নিয়েছে খুলনা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা কেন্দ্র খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এই হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যাসংখ্যা মাত্র ৪০টি। অথচ সেখানে গতকালের হিসাব অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল ১৪৬ জন। যা মোট শয্যাসংখ্যার চার গুণেরও বেশি। রোগীদের উপচে পড়া চাপ প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় সাধারণ রোগীদের পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্তদের মেঝে, বারান্দা এমনকি হাঁটার পথে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের নিচতলায় জরুরি বিভাগে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিশেষ ডেঙ্গু ইউনিট চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একইভাবে সংকট দেখা দিয়েছে খুলনা সদর হাসপাতালেও। সেখানে মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ২৫টি শয্যার বিপরীতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে ৬৫ জন। সেখানেও শয্যা খালি না থাকায় ভর্তি হতে না পেরে অনেক গুরুতর রোগীকে বাধ্য হয়ে বাসায় বা বিকল্প স্থানে ফিরে যেতে হচ্ছে।


এডিস মশার এমন ভয়াবহ বিস্তারের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে খুলনা সিটি করপোরেশনের ভেটেরিনারি অফিসার ড. পেরু গোপাল বিশ্বাস বলেন, নগরীর অধিকাংশ বাসাবাড়িতে গাছের টব কিংবা ছাদ বাগানে ড্রামে জমা পানি, ড্রেনে-খালে পড়ে থাকা ডাবের খোসা এবং উন্মুক্ত স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা দ্রুত বংশবিস্তার করছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে সেই কারণেই খুলনা অঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এমন মারাত্মক ও ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। আমরা এখনো যথেষ্ট সচেতন না হওয়ায় নিজেরাই নিজেদের অজান্তে আশপাশের পরিবেশ দূষিত করে এডিস মশার বংশবিস্তারে সাহায্য করছি।


স্বাস্থ্য খাতের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করেছিল। আগস্টের শুরু থেকে এই পরিস্থিতি প্রায় ভয়াবহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগের ১০টি জেলায় নতুন করে ১১৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে শুধু খুলনা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থেকে সরাসরি চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় ৪২০ জন রোগী। এর মধ্যে একা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা জেলার অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৭৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। চলতি বছরে এ পর্যন্ত খুলনা বিভাগে সর্বমোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৩০৫ জন মানুষ। ভয়াবহ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত খুলনা বিভাগে প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন।


পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হাসপাতালে সরেজমিনে যান খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। বর্তমান ভয়াবহতা সম্পর্কে তিনি বলেন, খুলনা অঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো ঘুরে ডেঙ্গু পরিস্থিতির যে ভয়াবহ রূপ দেখেছি, তাতে আঁতকে উঠতে হয়। কোনো সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য আর কোনো শয্যা ফাঁকা নেই। এই মুহূর্তে মারাত্মক এই ডেঙ্গু মহামারি মোকাবিলায় আমরা প্রশাসনিকভাবে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছি। এই কঠিন কাজটিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা খুলনা নগরবাসী ও সরকারের সর্বোচ্চ সহযোগিতা কামনা করছি।


এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতার পরামর্শ দিয়ে রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাজেদুল হক কাওছার বলেন, এডিস মশার বংশবৃদ্ধি কার্যকরভাবে রোধ করতে হলে নগরবাসীকে প্রথমেই নিজ নিজ ছাদের ওপর থাকা ফুলের টব, ড্রাম ও আশপাশে জমা হয়ে থাকা যেকোনো ধরনের পানি সাথে সাথে অপসারণ করতে হবে। কারণ মশা যদি ডিম পাড়ার জন্য পরিষ্কার পানি না পায়, তবে তারা কোনোভাবেই বংশবিস্তার করতে পারবে না এবং ডেঙ্গুর প্রকোপও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

আকাশজমিন / আরআর



এ সম্পর্কিত আরো খবর